'সূর্যোদয়' ছোট গল্প, লেখা: নাসিম কবির

 'সূর্যোদয়'

লেখা: নাসিম কবির


কলেরা মহামারীতে গ্রামটা মৃত্যুপুরীতে রুপান্তরিত হলো। কলেরার ভয়ে কেউ কারো বাড়ি যাচ্ছে না। ঘরে ঘরে মৃত্যু বার্তা। প্রাণচঞ্চল গ্রামে হঠাৎ শোকের ছায়া নেমে আসলো। মাঝেমধ্যে কাকের কাকা ডাকে মুখর চারদিক।

চারদিক ঘেরা সবুজ গাছ, লতাপাতা স্থির হয়ে থমকে আছে। হয় তো গাছগুলো শোকাচ্ছন্নে নিরব কান্নায় মগ্ন।

স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু এর চমৎকার আবিষ্কার এসকোনোগ্রাফ যন্ত্রের মাধ্যমে বুঝা যায় উদ্ভিদেরও জীবন আছে। আল্লাহর সৃষ্টি কতোই না রহস্যময়।


সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। কুঁড়েঘরে প্রদীপ নিভু নিভু করছে। ঘরের মেঝেতে শীতলপাটি বিছানো, খাইরুন্নেসা অসুস্থ স্বামীর মাথার কাছে ছয় মাসের ছোট্ট হিমুকে নিয়ে বসে আছে।

আকব্বর আলি কলেরায় আক্রান্ত, তিনি মৃত্যুর প্রহর গুনছে। খাইরুন্নেসার চোখ দিয়ে পানি গাল গড়িয়ে আসে।


এই অজপাড়াগাঁয়ে কোন ডাক্তারের খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। থাকার মধ্যে মতলব কবিরাজ তিনি গাছের লতাপাতা দিয়ে ঔষধ বানিয়ে দেয়। যা গ্রামের মানুষের একমাত্র সম্বল। 

সবে কিছুদিন হলো দেশ ভাগ হয়েছে। ভারতবর্ষের পূর্ব অংশকে পূর্ব পাকিস্তান নাম দেয়া হয়েছে। হিন্দু ধর্মের মানুষগুলো যে যার মতো ভারত চলে যাচ্ছে, সেই ক্লান্তিলগনে কলেরা মহামারী কতগুলো তাজা প্রাণ নিয়ে যাচ্ছে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভুল করলেন, দ্বি-জাতি তত্ত্বের একদিন তার মাশুল দিতে হবে।


আকব্বর আলী পানি চায় খাইরুন্নেসার কাছে কিন্তু খাইরুন্নেসা পানি খেতে দিচ্ছে না। পানির কারনে যদি শরীর থেকে আরো পানি বের হয়ে যায়। 

মায়ের কান্নায় ছোট্ট হিমুও কান্না করছে। আকব্বর আলী হাত নাড়িয়ে ইশারা দেয় কিছু একটা বলতে চায়, হিমুর মা আমি মনে হয় আর বাঁচমু না। হিমুরে তুমি দেইখা রাইখো।

খাইরুন্নেসার কান্না আরো বেড়ে যায়। খাইরুন্নেসার ভেজা কন্ঠে, আপনার কিচ্ছু হইবে না, আম্নে চইল্লিয়া গেলে মোরা কেম্নে বাছমু! 


আস্তে আস্তে আকব্বর আলী নেতিয়ে যায়। খাইরুন্নেসার রোদনে আস্তে আস্তে রাতটা ভারী হয়ে আসে। 

ততোক্ষণে আকব্বর আলীর ছোট ভাই বৈদ্য নিয়ে আসে। বৈদ্য নাড়ী দেখে আকব্বর আলীকে মৃত ঘোষণা করে। কান্নায় চারদিক শোকের ছায়া পড়ে গেলো। আস্তে আস্তে ভোর হয়ে আসে বাড়িতে মানুষের আনাগোনাও বাড়ে যায়। সবার মুখে মুখে গুঞ্জন, বউডার বয়স এত্তো কম, বাকী জীবন তো পইড়াই রইছে। ৬ মাসের বাচ্চাডার কি হইবে। কেউ রইলো না বাচ্চাডার। খাইরুন্নেসার বয়স উনিশ ছুঁইছুঁই।


জানাজা শেষে গোরে দাফন করে আকব্বর আলীকে। আত্নীয়স্বজনেরা মৃত আকব্বর আলীর বউকে শান্তনা দেয়। কিন্তু প্রিয় মানুষ হারানোর যন্ত্রনা কি কারো কথায় ঘুচে!

মৃত আকব্বর আলীর ভাইয়েরা গা ছাড়া দিয়ে থাকে। হয় তো তাদের জন্য ভালই হলো, বাপের সম্পত্তির ভাগ কমলো। বউটাকে বাচ্চা সহ বিদায় করতে পারলে তারা বেঁচে যায়। 

আকব্বর আলীর মৃত্যুর একমাস কেটে যায়। খাইরুন্নেসাকে তার স্বামীর বাড়ির মানুষ প্রায়ই কথা শোনায়। পাশের ছনের ঘর থেকে সুর ভেসে আসলো, পোড়া কপালি, জামাইডারে খাইছে এহন মোগো খাওয়ার চিন্তা করতাছে।

খাইরুন্নেসা ঘরের ভেতর ছেলেকে নিয়ে নিরব কান্না করছে।

সাদা শাড়ীর আড়ালে বাচ্চাটা হাত-পা ছুড়াছুড়ি করছে। আর পাশের ঘর হতে খোঁটা দেয়ার শব্দ ভেসে আসছে।


খাইরুন্নেসার ভাই হাকিম মিয়ার গলার আওয়াজে খাইরুন্নেসা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

তাকে তার ভাই নিতে এসেছে। শ্বশুর বাড়ির লোকেরা খুব খুশি। একটা ঝামেলা বিদায় হচ্ছে বলে। মৃত আকব্বর আলীর বড় ভাই এগিয়ে আসলো দাত খোঁচাতে খোঁচাতে, আরে বিয়াই কখন আইলেন?

হাকিম মিয়া বলল, সবে মাত্রই, ভাবলাম বোইনডারে লইয়া যাই।

-হুম লইয়া যান, মোরা নানান ঝামেলায় থাহি দেখপার পারি না।

কথা বলে ওনি চলে গেলো। বড়ই খুশি মনে হচ্ছে। খাইরুন্নেসা বাপের বাড়ি যেতে নারাজ থাকা স্বত্বেও ভাইয়ের জোরাজোরিতে যেতে রাজি হলো। না গিয়েই বা কি করবে। শারীরিক নির্যাতন থেকে কথার নির্যাতনের তীব্রতা বেশি। বাচ্চাকে ভাইয়ের কোলে দিয়ে পোটলি গোছাচ্ছিল। এটাই হয় তো স্বামীর বাড়ি হতে শেষ যাওয়া। খানিক পর পর চোখের কোনে জমে যাওয়া পানি মুচ্ছিলো।

হাকিম মিয়া বলল, কান্দিস না বোন। মোরা কি মইরা গেছি? তোর ভাবি তোর লাইগা কান্দে।

কান্নার জন্য খাইরুন্নেসা কিছুই বলতে পারে না। হাকিম মিয়া একটু চুপ থেকে বলে, বাচ্চাডারে খাওয়া খিদা লাগযে মনে হয়।


সূর্য ঠিক মাথার উপরে খাইরুন্নেসা ভাইয়ের সাথে বাপের বাড়ি রওনা হয়। অনেকটা দূর হাঁটতে হবে। আঁকাবাঁকা পথের দু'ধারে লতাপাতা ছেয়ে আছে। মাঝেমধ্যে সামনে দিয়ে শিয়াল দৌড় দেয়। ঘরবাড়ি নেই তেমন। নির্জন পথ দিয়ে হিমুকে নিয়ে দুই ভাইবোন এগিয়ে চলল। বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য পশ্চিম দিকে হেলিয়ে পড়ে।


হাকিম মিয়ার বউ, ছেলেমেয়েদের অপেক্ষার অবসান হয়। হাকিম বিয়ার বউ খাইরুন্নেসার গলা জড়িয়ে কান্না জুরিয়ে দেয়। হিমুকে হাকিম মিয়ার মেয়েরা কোলে নিতে কাড়াকাড়ি লেগে যায়।


হাকিম মিয়া অনেক চিন্তিত বোনকে নিয়ে। এতো কম বয়সে বোনটা বিধবা হয়েছে, এখনো জীবনের পুরোটাই বাকী। ঘঠকের সাথে কথা বলে রেখেছে। ঘঠক পাত্রের সন্ধান পেলে জানাবে।

হাকিম মিয়ার হাক, হুনছো কেরাসিন তেলের বোতল টা দাও। আর মাটির কলসের মধ্য দিয়া দুই টাহা দাও বাজার করতে অইবে।

হাকিম মিয়ার বউ কেরোসিন তেলের বোতল এবং টাকা এগিয়ে দিতে এসে বলল, হিমুর লাগি মধু আইনো, পোলাডার ঠান্ডা লাগযে।

স্ত্রীর কথায় সায় দিয়ে হাকিম মিয়া বাজারে চলে যায়।


পরের দিন সকালে ঘঠক হাজির। হাকিম মিয়া ঘঠক'কে দেখতে পেয়ে বলল, বসেন ঘঠক সাহেব।

ঘঠক বলে ওঠলো, খাসা একটা ঘর আছে, ছেলে আইএ পাশ।

হাকিম মিয়া বলল, ছেলের বাড়ি কোম্নে? পাত্রীর কতা বেবাগ কইছেন?

হাকিম মিয়ার প্রশ্নে ঘঠক নাকচিটকে বলল, পোলাডা সহ নিবে না তারা। শুধু মাইয়া নিবে। আর বাড়ি মোগো দুই গ্রাম পর মসূয়াতে।

হাকিম মিয়া হিমু কে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লো। হিমুকে তার মামী মানুষ করলে তাতে তার বোনটার জীবনটা সুখের হবে। ছেলেও শিক্ষিত। যদি বর পক্ষের কিছু চাওয়ার থাকে তাহলে খানিক জমি বিক্রি করে উপহার সামগ্রী দেয়া যাবে।


ঘঠক'কে সম্মতির কথা জানাবে বলে ঘঠককে বিদায় দিয়ে হাকিম মিয়া বোনের পাশে দিয়ে দাঁড়ালো, খাইরু হুন একটা সমন্ধ আইছে। পড়ালেহা জানা পোলা।

খাইরুন্নেসা চমকিয়ে ওঠে বলল, ভাই মুই বিয়ে করমু না, আমার পোলাই আমার সব।

হাকিম মিয়া বলল, সমন্ধডা অনেক ভাল তুই সুহে থাকপি।

খাইরুন্নেসা বলল, আমার পোলাই আমার সুখ


হাকিম মিয়া তার বোনকে খুব করে বুঝালো কিন্তু কোনভাবে বিয়ের জন্য রাজী হলো না। তার শ্বশুর বাড়ির লোক হতে খরব এসেছে, তাদের থাকার ঘর মৃত আকব্বর আলীর ভাইয়েরা ভেঙে সেই জায়গায় নতুন ঘর তুলতেছে। আর আকব্বর আলীর সম্পদ ভাইয়েরা দখল নিয়েছে। 


এর মধ্যে প্রচুর বিয়ের প্রস্তাব এসেছে কিন্তু খাইরুন্নেসা বিয়ের জন্য রাজী হয় নি। 

হাকিম মিয়া বুঝে গিয়েছে কোন ভাবে তার বোনকে রাজী করানো যাবে না। তাই তিনিও হাল ছেড়ে দিলো।


দিন যাওয়ার সাথে সাথে হিমু বড় হতে থাকে। হিমুকে দিনের বেলা চোখে দেখা দুষ্কর সারাদিন এখানে-ওখানে দৌড়াদৌড়ি। পুকুরে লাফালাফি, জঙ্গলের পাখির বাচ্চার সন্ধানে ঘুরাঘুরি। ডাংগুলি খেলা, মার্বেল খেলা, লুকোচুরি খেলা ইত্যাদি দিয়ে ব্যাস্ত।

খাইরুন্নেসা হাকিম মিয়াকে বলল, ভাই হিমুরে ইস্কুলে ভর্তি করান।

হাকিম মিয়া বলল, হুম কাইল-ই লইয়া যাইবো ইস্কুলে। এই হিমু আয় দেহি এইদিকে।

হিমু বলল, মামা আম্মা মোরে গালি দেয় শুধু।

হাকিম মিয়া বলল, হারাদিন তো তোরে চোহেই দেহা যায় না, রোদে পুইরা পুইরা চেহারাডার কি অবস্থা হইছে। গালি তো দেবেই। কাল বেয়ান বেলা তোরে ইস্কুলে ভর্তি করাবো।

হিমু খুশি হয়ে চৌকাট পেরিয়ে বাহিরে দৌড় দিলো।


হিমুর মামী হিমুকে খুব আদর করে। মা বকা দিলে মামির কাছে আশ্রয় পায়। হিমুর মামা-মামী, মামাত বোনেরাও বেশ আদর করে। পরদিন হিমুকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়। রেগুলার স্কুলে যায় এবং পড়াশোনায় মনযোগ দেয় কিন্তু দুষ্টামি একদম কমে নি। 


হিমু মায়ের কোলে শুয়ে আছে হঠাৎ হিমু বলল, মা মোর ইস্কুলের সবার আব্বু আছে, মোর আব্বু কই?

খাইরুন্নেসা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আল্লাহর কাছে গেছে, তুমি বড় হইলে ফিরবে।

কি করে অভাগা মা বুঝাবে তার বাবা যে আর কোনদিন ফিরবে না। 

হিমু বলল, মা আমি কবে বড় অমু?

-হইবা একদিন খুব বড় হইবা।


হাকিম মিয়া খুব হাসিখুশি হয়ে বাড়ি ফিরলো, বউ গো হুনছো, খাইরু এম্নে আয় দেহি।

সবাই বেরিয়ে এলো। 

হাকিম মিয়া বলা শুরু করলো, হিমু পোলাডা উপবৃত্তি পাইবে। মাস্টারের সাথে আজ দেহা হইলো, মাস্টার কইছে হিমু খুব মেধাবী। কার ভাগিনা দেখতে হইবে না! বাড়ির সবাই খুশি হলো এই সংবাদে।

হাকিম মিয়া বলল, খাইরু জালটা দে, বিলে নাকি মাছ পড়ছে অনেক। হিমু যাবি রে মাছ ধরতে? 

হিমু হাজির হলো মামার ডাকে, হুম যাইবো।

মামা ভাগিনা মাছ ধরতে গেলো। বেশ মাছ পেয়েছে। বাড়ির সবাই গোল হয়ে বসে মাছ কাটা দেখছে এবং হিমুর মাছ ধরার গল্প শুনছে।


সময়ের সাথে সাথে হিমু বড় হতে থাকে প্রাইমারী ইস্কুল শেষে মাধ্যমিক ইস্কুলে হিমু পদার্পণ করলো। মেধাবী হওয়াতে উপবৃত্তির টাকা দিয়ে হিমুর পড়াশোনা চলে যায়। অন্যদিকে মামা হাকিম মিয়া হিমুর প্রতি আগের চেয়ে বেশি মনযোগ দিতে থাকে।

আজ হিমুর মেট্রিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে। খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আশেপাশে গ্রামের মানুষ হিমুকে দেখতে আসে। এ নিয়ে মানুষ কানাঘুষায় মগ্ন, এবার খাইরুন্নেসার দুঃখ ঘুচবে। জামাই মরা মেয়েডা বিয়ে পর্যন্ত করলো না ছেলেটার দিকে চেয়ে। হিমু একসময় গ্রামের গর্বের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।


সময় যাচ্ছে পরিবারের টানাপোড়নও বাড়ছে। অভাগা মামার কি সাধ্য আছে পরিবার চালিয়ে হিমুর পড়াশোনার টাকা যোগানোর! তবুও চেষ্টার কমতি রাখে নি। 

হিমু বইয়ের অর্থের অভাবে মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে পড়া লিখে আনে, বই ধার করে এনে পড়ে।


বাড়ির পাশে বকুল গাছের নিচে হিমু মন খারাপ করে বসে আছে। ঝড়ো বাতাসে বকুল ফুল পড়তে থাকে কিন্তু হিমু স্থির।

হিমুর মামা হাকিম মিয়া ছুটে আসলো, হিমু বাড়ি যা বৃষ্টি আইবে।

হিমু মন মরা হয়ে কিছু বলছে না।

আবার হাকিম মিয়া বলল, কিছু অইছে তোর?

হিমু বলল, মামা সামনে আমার আইএ পরীক্ষার ফরম ফিলাপ। কলেজ থেকে জানাইয়া দিছে পঞ্চাশ টাহা লাগবে। 

হাকিম মিয়া হেসে উওর দিলো, অইয়া যাইবে চিন্তা হরিস না। আল্লাহ চাইলে সব ব্যবস্থা হইয়া যাইবে। অন্যদিকে হাকিম মিয়ার গিন্নী অসুস্থতায় বিছানায় কাতরাচ্ছে। যা জমানো ছিলো তা দিয়ে গিন্নীর চিকিৎসা করাবে বলে মনস্থির করেছিলো কিন্তু হাকিম মিয়া মুচকি হাসি দিয়ে হিমুকে ডাকলো। হিমু হাকিম মিয়ার সামনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে। 

হাকিম মিয়া বলল, হিমু এই'ল পঞ্চাশ টাকা। ফরম ফিলাপ কইরা আয়। আর পরীক্ষায় কিন্তু ফাস্ট ডিভিশন পাওয়া লাগবে।

তা বলেই হাকিম মিয়ার চোখ পানিতে জ্বলজ্বল করে ওঠলো, অন্যদিকে হিমু আনন্দে কেঁদে ফেলল। 


বাহিরে প্রচন্ড ঝর হচ্ছে। অন্ধকারে মাঝেমধ্যে বিজলি চমকাচ্ছে। হিমুর মামীর শরীর খুব বেশি খারাপ হয়ে যায়। এই ঝড়ের মাঝে হাসপাতালে নেয়ার মতো কোন অবস্থা নেই। ততোক্ষণে হিমুর মামী শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। পাশের ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ হিমু পাশের ঘর পর্যন্ত কিছুই বুঝাযাচ্ছে না। 

হাকিম মিয়া ভিজে একাকার হয়ে হিমুর দরজায় কড়া নাড়লো, হিমু দুয়ার খোল।

বৃষ্টিতে ভেজা হাকিম মিয়ার কান্নাভেজা সুরে বলল, হিমু তোর মামী মইরা গেছে। আস্তে আস্তে আকাশটা আরো ভারী হয়ে ওঠলো।

মামী গত হবার শোকের মাঝে হিমু পরীক্ষায় বসলো। রেজাল্টে ফাস্ট ডিভিশন পেলো। সেই রেজাল্টের পেছনের মামার ত্যাগ হিমু জানার পর সে আরো ভেঙে পড়ে। যদি ফরম ফিলাপ না করতো সেই টাকা দিয়ে মামীর চিকিৎসা হতো। আল্লাহ চাইলে মামি বেঁচে থাকতেন।

ততোদিনে হিমু বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়ে যায়।

খাইরুন্নেসা এবং হাকিম মিয়ার খানিক দুঃখের অবসান হলো। হিমু টিউশন করিয়ে যা পায় তা দিয়ে পড়াশোনা এবং পরিবারকে একটু সহযোগীতা করেতে পারে। এভাবেই চলতে থাকে। হিমু ছাত্র অবস্থা হতে গ্রামের মানুষের পাশে দাড়ায় বিনা টাকায় চিকিৎসা দিয়ে, যেন কেউ চিকিৎসার অভাবে মারা না যায়। অনেক সম্মানের পাত্র হিসেবে হিমু স্হান পায়। অজোপাড়া গায়ে চিকিৎসক পাওয়া যেন কোন এক ফেরেশতার সাথে সাক্ষাৎ।


বসন্তের এক সকালে ইসাক বয়াতি ছুটে এলো হিমুর বাড়িতে। ইসাক বয়াতি জমিদারের খুব কাছের লোক। বয়াতির গলায় বেশ জৌলুশ।

ইসাক বয়াতি বলল, বাবা হিমু জমিদাররে বাঁচাও, ওনার মেলা অসুখ। মোর লগে লও।

হিমু বলল, ঠিক আছে চাচা।


দেশ ভাগ হবার আগে জমিদারিত্ব ছিলো কিন্তু কালের বিবর্তনে তা বিলুপ্তি হয়েছে।

হিমু জমিদারের চিকিৎসা করতেছিলো অন্যদিকে জমিদারের অসুস্থতার জন্য জমিদারের সেজ মেয়ে পুতুলের জন্য পাত্র খুঁজতেছে। গন্যমান্য লোকেরা জমিদারকে বলল, আপনি দূরে কেন যাচ্ছেন উপযুক্ত ছেলে আপনার বাড়ি দৈনিক আসছে। 

জমিদার রেগে গিয়ে বলল, ঐ ছেলের সাথে আমার মেয়ে বিয়ে দিবো! আপনাদের মাথা ঠিক আছে?

গন্যমান্য ব্যাক্তিরা বলল, আপনি একটু পর্যবেক্ষণ করেন, ছেলেটা মাটির মানুষ। এমন ছেলের সাথে বিয়ে দিলে আপনার মেয়ে ভাল থাকবে। 

সবার কথায় জমিদার একটু চিন্তিত হয়ে ব্যাপাটা খতিয়ে দেখলো।


হিমু দৈনিক জমিদারের চিকিৎসার জন্য জমিদার বাড়ি আসে। অতঃপর একদিন জমিদার বলল, হিমু এখানে বস৷ তোমার সাথে কিছু কথা আছে।

হিমু চুপচাপ বসে আছে।

জমিদার বলল, আমি আমার সেজ মেয়ে পুতুলকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই। 

হিমু কি বলবে বুঝে উঠতে না পরে বলল, আমার মা, মামা আছে। ওনাদের সিদ্ধান্ত-ই আমার সিদ্ধান্ত। 


জমিদারের কন্যা পুতুলের সম্মতি নিয়ে হিমুর মা-মামার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। জমিদারের প্রস্তাবে হিমুর মা এবং মামা রাজী হয়। ধুমধামের মাধ্যমে হিমু এবং জমিদার কন্য পুতুলের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের আমেজে সকল গ্রামের মানুষ বেশ আনন্দিত। 


বসন্তের সকালে হিমু জমিদার বাড়ির ২য় তলায় বসে চা পান করছে। বাড়ির সামনে বসন্তে ঝরাপাতা গুলো বিছিয়ে পড়ে আছে। চোখ গেল সজনে ডালে, দোয়েল পাখি দোল খাচ্ছে নিমিষে হলদে পাতা গুলো ঝড়ে পড়লো।

আকাশটা বেশ মেঘলা হঠাৎ করে আকাশে বিদ্যুৎ চমক দিয়ে সাথেসাথে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির রিমিঝিম ধারায় হিমুর বেশ লাগছে। ঘর হতে সুরেলা কন্ঠে পুতুল বলল, এই, রবীন্দ্র সংগীত শুনবেন?

হিমু মুগ্ধ কন্ঠে বলল, হুম মন্দ হয় না।

গ্রামোফোন রবীন্দ্র সংগীত বাজতে শুরু করলো-


"মেঘের পরে মেঘ জমেছে

আঁধার করে আসে

আমায় কেন বসিয়ে রাখ

একা দ্বারের পাশে..."


-----সমাপ্তি----


বি.দ্র.: লেখাটিতে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, লেখায় ভুলত্রুটি মার্জনীয়।

অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

-ধন্যবাদ

Comments

Popular posts from this blog