নাইট মেয়ার, ছোট গল্প। লেখা- নাসিম কবির
'নাইট মেয়ার'
লেখা: নাসিম কবির
ভোর থেকে রিমঝিম বৃষ্টি। মেঘলা দিনের অবসন্নতা কাটিয়ে সন্ধায় হাতে চা নিয়ে ২১ নাম্বার গলির এক টং দোকানে বসে আছি। খানিক পরপর চায়ে চুমুকের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছি অতীত কোন এক বসন্তের আগমন দৃশ্যে।
তখন আমার বয়স ছয় কি সাত হবে। শীতের আমেজ কেটে বসন্তের আগমনে পুকুরের পানি প্রায় হাঁটুর নিচে। নিচ থেকে পাতাবিহীন ডালপালার ফাঁকে আকাশ দেখা যায়। আমার শৈশবের ছোট্ট পায়ের ছাপে গাছের পাতা গুলো মর্মর শব্দে যখন আন্দোলিত। তখন পুকুরে বেশ বড় এক কাতল মাছ আমার চোখে পড়ে। ততক্ষণে দেরি না করে আমার পানিতে ঝাপ। মাছের সাথে ঝাঁপাঝাপিতে কাতল মাছটা আমার কাছে হার মানে। অতঃপর আমি উপড়ি বসে গালে হাত দিয়ে মায়ের মাছ কাটা উপভোগ করি। সেদিন গ্রাম্য মেলা ছিলো, অনেক খন্ড খন্ড স্মৃতিতে জড়ানো আমার শৈশব।
ভাবতে ভাবতে কখন যে চা ঠান্ডা হয়ে গেলো বুঝতেই পারি নি। যখন চায়ের কাপ এগিয়ে দিবো তখন চোখ গেল 'নাইট কুইন থাই চাইনিজ রেস্টুরেন্ট' এর ২য় তলায়। আমার চোখ রীতিমতো অবাক। মধ্যবয়সী এক মেয়ে, গায়ে পাথুরে কাজে সজ্জিত সাদা জামা। হাত নাড়িয়ে পাশে থাকা ভদ্র বৃদ্ধার সাথে কথা বলায় চারপাশের আলোতে ঝলমলে ওঠলো। মাঝেমধ্যে হেলে পড়া চুল সরাচ্ছিলো। কি মসৃণ তার হাসি। আমার দেখা নাইট কুইন।
মাঝেমধ্যে রেস্টুরেন্টের নামের হিসেবটা আমার মাথায় ডুকতো না। রেস্টুরেন্টের নামটা সার্থকতা পেতে যাচ্ছে।
রেস্টুরেন্ট মালিক যদি আমার সাথে চা আড্ডায় থাকতেন তাহলে হয়তো একই দৃশ্যপটে ওনার চোখও আটকে যেতো।
নারী সৌন্দর্য দূর থেকেই সুন্দর। একা যতোটা ভাল থাকা যায় ততোটা পৃথিবীর শ্রেষ্ট সুখের মাঝে অন্যতম।
পুনরায় আর এককাপ চা নিয়ে সিগারেটের ধৌয়াতে ঐ দৃশ্যটা গুলিয়ে ফেললাম।
ঘুরিঘুরি বৃষ্টি পড়ছে রাস্তায় বের হলে ভিজে যাবো, অসুস্থতার চিন্তা না করে বের হয়ে গেলাম টিনের ছাউনি থেকে। হাঁটতে থাকি অজানায়। বৃষ্টিতে ভিজতে মন্দ লাগছে না। গলির রাস্তা অনেকটা ঘুটঘুটে অন্ধকার আমার পেছন থেকে কেউ আসার অনুভূতি পাচ্ছি। কিছু বুঝার আগেই পেটে ছুরি তাক করে বয়স্ক গলায় একজন-
-মোবেইল, টেহা বার হর। নাইলে ছুরি মাইরা দিবাম।
আমি মোবাইল ব্যবহার করি না, চা-সিগারেট বিল দিয়ে পকেটে পনের টাকা পঞ্চাশ পয়সা অবশিষ্ট। আমি ইতস্তত বোধ করে কিছু না বলে মানিব্যাগ ওনার হাতে তুলে দিলাম।
মোবাইল না পেয়ে মানিব্যাগ নিয়ে চলে গেলো।
একটু শান্তি অনুভব করতেছি। টাকা বিপদের এক মাধ্যম হতে পারে। বিপদ না থাকাই ভাল।
পরবর্তী ছিনতাইকারী পথ আটকালে তাকে দিতে পারবো না ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। দুঃসাহসিক কাজের পারিশ্রমিক অবশ্যই পাওয়া উচিৎ।
উদ্দেশ্য বিহীন বৃষ্টিভেজা পিচঢালা রাস্তা চলতে বেশ লাগে, গ্রামের কাঁচারাস্তাও বেশ লাগে কিন্তু বৃষ্টিতে মুশকিল। ততোক্ষণে অনেকবার পিছলে পড়ার অভিজ্ঞতা হতো।
সামনের ২৯ নাম্বার গলিতে গেলে বন্ধু নাসেরের দেখা পেতে পারি। প্রেমিক পুরুষ বটে। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে অলিতেগলিতে দাঁড়িয়ে প্রমিকার সাথে কথা বলে। ভাগ্যিস সে ভাল রেজাল্ট করায় তার বাবা মোবাইলটা কিনে দিয়েছিলো। নয় তো চিঠির মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকতো। মানুষের হাতে মোবাইল দেখা দুষ্কর। সেই হিসেবে সোনার হরিণ পাওয়া এক প্রেমিক।
নাসেরকে খোঁজে বের করতে পারলে ১ টাকা নেয়া যেতো। কোথাও হারানোর সাথে সেই টাকায় দু'কাপ চায়ে মন্দ হতো না।
নিজেকে মাঝেমধ্যে পাখি ভাবি। এখন নিজেকে ভেজা কাক মনে হচ্ছে। শহুরে আলিগলিতে ছুটে বেড়ানো এক কাক। ইচ্ছে করছে কাআআআ কাআআ ডাকি।
দূর থেকে নাসেরের ছায়ামূর্তি চোখে পড়লো। সোডিয়াম লাইটের নিভুনিভু আলোতে চিনতে ভুল করি নি।
আমার ভুল হয় না চিনতে। এই তো সপ্তাহ খানেক আগে, আমার ক্লাসমেট মালিহা খাতুন ওনাকে হিজাবে আগে কখনো দেখিনি কিন্তু সেদিন হিজাবে আচ্ছাদিত মালিহা খাতুন কে চিনতে ভুল করি নি।
একটু সামনে এগুতেই নাসেরের হাক, বন্ধু তুমি!
নাসের অবাক হলো নাকি তাদের কথোপকথনে কাবাবের হাড্ডি হলাম জানি না। সে কথা পরে ভাবা যাক।
আমি একটু হেসে, হুম এই দিকেই যাচ্ছিলাম, প্রেমিক পুরুষের দর্শন পাওয়া আমার ভাগ্যের ব্যাপার।
কথা শেষ না হতেই নাসেরের অট্টহাসি। নিশ্চিই তার প্রেমিকা ভয় পেয়েছে। হয় তো মনে মনে পড়ছে,
"আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বিওঁ ওয়া আতুবু ইলাইহি; লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম"
নাসের বলা শুরু করলো, কোথায় থাকো সারাদিন? দুইবার তোমার বাসায় গিয়ে দেখি দরজায় তালা।
-হুম, বাহিরে ছিলাম হয় তো।
নাসের তাড়াহুড়ো করে বলতে শুরু করলো, সাইকেল ঠিক করেছি কাল সকালে মানিকগঞ্জ যাচ্ছি। সাটুরিয়া জমিদার বাড়ি দেখবো। রাত্রি হয়ে গেলে ডাকবাংলোতে থাকবো সেখানে আমার মামা আছে।
- ঠিক আছে। আপাতত এক টাকা দাও। ঐদিকে যাবো চা খাওয়া দরকার।
নাসের টাকা বের করবে ততোক্ষণে মোটা দেহী দুই জন এসে হাজির।
একজন বলে ওঠলো, একটু এইদিকে আসেন। কথা আছে।
আমি ভাবলাম হয়তো ছিনতাইকারী। আমার কাছে কোন টাকা-মোবাইল না থাকায় আমি গেলাম বিশালদেহী দুই লোকের সাথে।
আমি বললাম, কিছু বলবেন? লোক দুই কথা বলছে না।
কিছু ব্যাপার কথা বলছেন না কেন?
পেছন অন্ধকার থেকে আরেকজন এসে মুখে রুমাল চেপে ধরলো। চোখ লেগে আসছে প্রায়।
অতঃপর.....
নিজেকে আবিস্কার করলাম বেডে শুয়ে থাকা অবস্থায়। বাহিরে বাচ্চাদের চেঁচামেচি মনে হচ্ছে খুব আমেজে আছে। কোথায় আমি! নাকি আমার মৃত্যু হয়েছে! নাকি পরকালে অবস্থান করছি কিন্তু আমি কবরে নেই কেন, মুনকিরনাকির ফেরেশতা তো প্রশ্ন করলো না। গায়ে ভেজা শার্ট প্যান্টের পরিবর্তে সাদা পায়জামা গায়ে পাঞ্জাবী কেন।
নাকি স্বপ্নে আছি। নিজের গায়ে চিমটি খেলাম। উফ্ ঠিকঠাক ই তো আছি।
কেউ আছেন? শুনছেন? কেউ আছেন?
কোন রেসপন্স নেই। শুয়ে থাকা থেকে ওঠে দরজার কাছে গিয়ে খোলার চেষ্টা করি। বাহির থেকে তালা দেয়া মনে হচ্ছে। নাহ্ আমি মরি নি। এ কি মসিবতে পড়লাম, কি হচ্ছে এসব। নাসের কোথায়, ওকি আমার অবস্থায় আছে। নাকি অলিগলিতে প্রেমিকার সাথে কথোপকথনে ব্যস্ত।
চোখ বন্ধ করে খাটে শুয়ে আছি, খানিক ঘুমিয়ে নেই। এখন মনে হচ্ছে আমার কোন পিছুটান নেই। সময়মতো খাবার আসলেই হলো। অবশ্য খাবারটা এখনই প্রয়োজন ছিলো।
চোখ লেগে আসছে খটখট শব্দে ওঠে বসে গেলাম। কেউ একজন খাবার নিয়ে আসছে।
আমি বললাম, কি ব্যাপার এভাবে আটকিয়ে রাখার মানে কি? আর আমি এখনে কেন?
-বড়সাবের মেয়ের সাথে আজ রাতে আপনার বিয়ে।
-মাথা ঠিক আছে আপনার? আমি কেন বিয়ে করতে যাবো?
-কর্তা চাইছে
-কর্তা চাইলেই হবে নাকি? মগেরমুলুক নাকি! আপনাদের পুলিশে দিবো।
লোকটা কিছু না বলে চলে গেলো। মাথা ঘুরছে, কপাল ঘামছে। গলা শুকিয়ে কাট হয়ে গিয়েছে তৎক্ষনাৎ জগের অর্ধেক পানি শেষ করে ফেললাম।
আমার তিনকুলে বলতে কেউ নেই, থাকার বলতে শুধু আলিম চাচা এবং চাচী। ওনাদের কাছেই আমি বড় হয়েছি। ওনাদের সন্তানসন্ততি বলতে আমিই। আমার পিছুটান বলতে ওনারাই।
মানুষের ভালবাসায় আমার বেড়ে ওঠা। ইয়াসিন বয়াতির যা গলা আধ্যাত্মিক গান গুলো আমাকে ছুয়ে যায়। দেখা হলেই বলে, বাজান তোমারে দেখেশুনে লালটুকটুক একটা মেয়ে বিয়া করাইবাম। বয়াতির চাচার ইচ্ছের কি হবে, আলিম চাচাকে কি জবাব দিবো। ওনার সরল মনটা চৈত্রের মাঠের মতো চৌচির হয়ে যাবে।
সন্ধা ঘনিয়ে আসছে, সত্যিসত্যি কিছু একটা হবে মনে হচ্ছে। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আলোক ঝলমলে চারদিকে। খাবারের ঘ্রাণ আসছে। মেহমান আগমনে হৈচৈ অবস্থা।
হঠাৎ তালা খুলার খটমট শব্দে ঘরে কারো উপস্থিতি অনুভব করতে পারলাম। হঠাৎ কেউ অন্ধকার রুমে টাইট জ্বালাললো। আমি নিজ চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। নাইট কুইন!!
আমি অবাক হয়ে বলি, আপনি!!
ওনি অবাক হয়ে বলল, আপনি আমাকে চিনেন নাকি?
আমি বললাম, ইয়ে না মানে
মেয়েটা একটা হাসি দিলো। হাসিটা বেশ সুন্দর। মনে হচ্ছে কোন এক পরীর আগমন। আমি নাম জানি না কিন্তু মেয়েটা আমার কাছে নাইট কুইন। আগে রেস্টুরেন্টে পরিপূর্ণতা পেয়েছিলো। এখন কুইন হয়ে আমার জীবনটা পারিপূর্ণ করবে।
মনের অজান্তে একপ্রকার ভাললাগা অঙ্কুরিত হলো। এই বিয়েতে আমার কোন আপত্তি নেই মনে মনে ভেবে ফেললাম।
মেয়েটা বলল, -আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো
-জ্বী বলেন
-একটা বড় এক্সিডেন্ট হয়ে গিয়েছে, তাই একপ্রকার জোরপূর্বক আপনাকে বাধ্য করা হচ্ছে। আপনার আপত্তি আছে?
কথা বের হচ্ছিলো না, মুচকি হাসি দিলাম। অতঃপর মেয়েটা চলে গেলো। হয় তো বুঝতে আর বাকী রইলো না। এখানে আমার চাওয়া, না চাওয়া কিছুযায় আসে না। তবুও আমার চাওয়াটা জানতে চেয়েছে, তা মন্দ কি! মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি আসার মতো ঘঠনা।
বেশ খুশি আমি। বড় সাহেব এসে আমার সাথে দেখা করলেন, ওনারা ঝামেলা করতে চাচ্ছেন না বলে রাতেই বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করতে চান। আলিম চাচা, ইয়াসিন বয়াতি চাচা থাকলে ওনারা খুব খুশি হতেন। অনেক রিকুয়েষ্ট করার পরও ওনারা রাজী হয় নি।
অন্যরুমে নিয়ে গেলো আমাকে, বেশ আয়োজন আমাকে নিয়ে। শেরওয়ানি, পাগড়ি সহ বিয়ের জিনিসপত্র নিয়ে হাজির ঐ মোটাদেহী লোকটা। বলল, এগুলো পড়ে নেন বাবুসাব। সবাই আপনার জন্যি অপেক্ষায় আছে।
লোকটাকে আমার মোটেও পছন্দ না। চুপচাপ ছিলাম তৎক্ষনাৎ ওনি স্থান ত্যাগ করলো।
আমি বরের সাজে প্রস্তুত। কথায় আছে ''দিল্লিকা লাড্ডু জিসনে খায়া উসনে পস্তায়া, জিস্নে নহি খায়া উস্নে ভি পস্তায়া'' খেয়েই দেখি।
ততোক্ষণে কাজীর রেজিস্ট্রি খাতায় সাক্ষরের মধ্যদিয়ে বিয়েটা সম্পন্ন হলো। মোনাজাতের পর চারদিকে মিষ্টির ছড়াছড়ি যেন দিল্লিকা লাড্ডু।নাইট কুইনের সামনে কিভাবে দাঁড়াব ভেবেই লজ্জায় ভেতরে সুরসুরি লাগছে।
বিয়ের সকল আয়োজন শেষে রাত একটা চল্লিশ বাজতে চলল। দক্ষিণের একটা রুম গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা দিয়ে সজ্জিত করা হলো।
ততোক্ষণে রুমে গিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ। বড় মাপের একটা ধাক্কা খেলাম।
অচেনা একটা মেয়ে, যাকে আমি আগে কখনো দেখি নি। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলাম।
ঠান্ডা গলায় বললাম, আপনারা কয় ভাইবোন?
-আমরা দুই বোন, আমি বড়।
-ও আচ্ছা, আমার সাথে যে দেখা করেছিলো সে কি আপনার ছোট বোন?
-জ্বী
নিমিষেই চোরাবালিতে আমার স্বপ্ন গুলো তলিয়ে গেলো। আমি শান্ত হয়ে বসে আছি। বউয়ের কথায় হু হ্যা উত্তর দিচ্ছি।
বিয়ের পাঁচবছর চলে গেলো। অনেক ঝড়ঝাপটার পর গ্রামের বসতভিটাতে ফিরে এলাম। কিন্তু আজও বউকে বুঝতে দেই নি কিছু। খুব ভবঘুরে ছিলাম খুব, নাইট মেয়ারে আমি আজ সংসারী পুরুষের মধ্যে একজন।
আজ ফাল্গুরের প্রথম দিন, শীতের আমেজ এখনো কাটে নি। ওঠানে রোদ পোহাচ্ছি।
এই দিকে বউ এর হাক, এই শোন বাচ্চাটাকে নিয়ে বসো তো। এতো বিরক্ত করে ছেলেটা।
আমি হেসে, আনো আনো ওরে ভিটামিন-ডি খাওয়াই।
Comments