লাল শার্ট, ছোট গল্প। লেখা- নাসিম কবির
''লাল শার্ট''
লেখাঃ নাসিম কবির
মানুষ খুব নিষ্ঠুর বুঝলা মতি? বিষন্ন মনে মতি মিয়া বিড়ি টানছে।
কি না করলা ওর জন্য, অবশেষে মেয়েটাকে পাঠিয়েই দিলো। ততোক্ষণে মতি মিয়া ক্ষেতের আইলে গাছের নিচে বসে একটার পর আরেকটা বিড়ি ধরাতে থাকলো। উপরে গাছের পাতার ফাঁকে মাথার উপর বাজপাখি চক্কর দিচ্ছে। বৈশাখ মাস শেষের দিকে আকাশটা মলিন। মাঝে মাঝে গুরুমগুরুম শব্দ হচ্ছে।
মতি মিয়া চল বাড়িতে যাই, আসমানের অবস্থা বেশি একটা ভাল না।
গম্ভীর ভাবে মতি মিয়ার উওর দিলো, আলিম আমার মনটা কেমুন জানি করে। মেয়েডার চোক্ষের দিক তাকাইতাম পারি না।
মতি মিয়ার মেয়ের বিয়ে হয় পাশের গ্রামের এক মহাজনের ছেলের কাছে, ছেলে দেখতে রাজপুত্তুর তারজন্য মতি মিয়ার কম দাম দিতে হয় নি। দু দু'টো হালের বলদ পাঁচ হাজার পাঁচশত টাকায় বেঁচে সেই টাকা রাজপুত্রকে দেয়া লাগলো। সেইসব তো বিয়ের সময়কার কথা বিয়ের পরের চাওয়া-পাওয়ার ইয়ত্তা হিসেব নেই।
মলিন মুখে মতি মিয়া বাড়ির দিকে চললো।
আমি মতি মিয়ার ছোটকালের বন্ধু অনেক দিন পর গ্রামে আসা হলো। মতি মিয়ার বাড়িতেই ওঠেছি। আমার আছে বলতে শুধু বাপের ভিটেটা, সেখানে পুরোনো মাটির ঘড়ে লতাপাতায় বাড়িটা জড়িয়ে আছে। উপ শহরে থাকি সদ্য রিটায়ার্ড ইস্কুলের কেরানি আমি। এতোদিনের জমানো টাকায় মাসিক খরচ বাবদ ছেলের ইচ্ছায় জায়গা কিনে দুচালা একটা টিনের ঘর তুলেছি। আর অবশিষ্ট শুধু বাবার রেখে যাওয়া ভিটে টুকু বাকী। কিছু দিন গ্রামে থেকে চলে যাবো, গ্রাম খুব টানে আমাকে। কত স্মৃতি জরিয়ে আছে এই গ্রামকে নিয়ে।
পুকুরে ঝাঁপাঝাপি, জঙ্গলে জঙ্গলে পাখির পিছু ছোটাছুটি, নিত্যদিনে নতুন নতুন স্বপ্ন। অনেক স্মৃতি তা বলে শেষ হবে না।
হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে চলে আসলাম। ঐ দিকে মতি মিয়ার গিন্নীর শরীরের অবস্থা অবনতির দিকে। তিনি নানা সমস্যায় জর্জরিত।
আমাদের শব্দ পেয়ে মতি মিয়ার গিন্নী অসুস্থ শরীরে ওঠে এলো, ভাইজান আপনি কষ্ট করতাছুইন।
আমি কষ্টপেলুম তাদের পরিবারের দুর্দিন দেখে। আমি চুপ ছিলাম, এমতাবস্থায় কিছু বলার ভাষা আমার জানা নেই। ঐদিক থেকে মতির ছোট ছেলে ছুটে এলো, মা মা আমি বৈশাখী মেলায় যাইবাম। আব্বারে কইবা আমারে একটা ঘুড্ডি কিন্না দিতে?
মতি মিয়ার গিন্নি, আচ্ছা বাপজান
-মা আমার ইস্কুলের শার্ট আছে তা পড়ে সবখান যাইতে মন চায় না। আব্বারে কইবা একটা লাল শার্ট কিইন্না দিতে?
-আচ্ছা বাজান, তুমি যাও। নিলুর কাছে একটু পড় গিয়া।
মতি মিয়া ছেলের আবদার টিউবওয়েল থেকে শুনলো। অভাগা বাবার যে সাধ্য নেই, আছে শুধু একটুখানি তাতে ফসল করে কোন মতে টানাপোড়েনে সংসার চলে মতি মিয়ার। জমানো যা ছিল তা নিলুর শ্বশুর বাড়িতে খরচ করে আজ কিছুই অবশিষ্ট নেই।
-নিলুর মা তুমি বিছানায় যাও তোমার শরীর ভালা না, ডাক্তার বাবুর থেইকা বড়ি আনবাম মাগরিবের পরে।
-আইচ্ছা, মা নিলু?
নিলু ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। নিলুর হাতে মুখে কালো শ্বশুর বাড়ির মারের দাগ। বজ্জাত জামাইয়ের নির্যাতনের স্বীকার নিলু। জামাই জাতীর পেটটা থাকে হাতির ন্যায় তাদের চায় চায় চাহিদা আমৃত্যু পর্যন্ত থাকে। তাদের যত্নের কোন ত্রুটি মানা যাবে না। সোনার চামচ মুখে নেয়া জামাই এর বিপরীতে তাহার পত্নী যেন নর্দমা থেকে ওঠে আসা অবহেলিত পশু।
তারপরও নিলু সহ্য করে আছে, কথা একটাই বিয়ে মানুষের বার বার হয় না। মারুক কাটুক সবকিছু সহ্য করতে হবে।
চারদিকে অন্ধকার হয়ে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে ছনের চালে ছুপছুপ ফোঁটা পড়তে থাকে। প্রকৃতির এক অপরুপ সৌন্দর্য। বাড়ির কলাপাতার বেড়ার উপর বাঁশ ঝাড়ের অগ্রভাগ আন্দোলিত। প্রকৃতির এ মহিমা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই।
নিলু খাবার দিলো দুই বন্ধু দুপুরে খাবার খেতেখেতে মতি মিয়া কিছু একটা বললো মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতে একটু অন্যমনষ্ক হয়ে গিয়েছিলাম।
-কিছু বললা মতি?
-ক্ষেতে বোর ধান পাকছে, এই বদলা দিনে একটু চিন্তায় আছি। ধান কি ঘরে তুলতারবাম?
-দিনের অবস্থা ভাল হলে কেটে ফেলো।
-তাই করতে হইবো (মতি মিয়ার দীর্ঘশ্বাস)
আজ আমাবস্যায় রাতটা বেশ ঘুটঘুটে অন্ধকার গ্রামে ধান কাঁটার সময়ে পুঁথি পাঠের আয়োজন হয়। ইয়াসিন বয়াতির বাড়িতে আজ পুঁথি পাঠের আয়োজন।
- আলিম তুমি গ্রামে আসায় ইয়াসিন বয়াতি আজ দাওয়াত দিয়া গেছে পুঁথির আসরে।
- হ্যাঁ চল, অনেকদিন পুঁথি শুনি না।
অন্ধকারে ব্যাটারীর টর্চ জ্বালিয়ে হাঁটা শুরুকরলাম। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে হারিকেন এর আলো, পুঁথি পাঠের আওয়াজটাও কানে আসলো। কাছে যেতেই ইয়াসিন বয়াতি পুঁথি থামিয়ে, আহো আলিম৷ তোমার লাগি বারছাইতাছিলাম, বসো। আলিম তোমার লাগি মনটা আমার পোড়ে! কত্তদিন পরে দেখলাম তোমারে।
ইয়াসিন বয়াতি আমার ৬/৭ বছরের বড় হলেও এককালে তাহার সাথে আমার ভাল খাতির ছিল। গ্রামে না থাকার জন্য যোগাযোগ হয় না, কোন সময় কয়েকখান চিঠিতে যোগাযোগ হয়েছিল।
পুঁথি পাঠ শুরু হয়ে গেলো-
''শুনো শুনো বন্ধুগণ শুনো দিয়া মন
কমলা সুন্দুরীর কথা করি যে বর্ণন
হিরণ নগরের মেয়ে কমলা সুন্দুরী
রূপের কথা কি বলিব রূপ যে ছিল ভারী
হিরণ নগরে ছিল এক যে রাজকুমার
কমলা সুন্দুরির সনে বিয়া হয়লো তার
লাল নিল সবুজ বড়ির দিঘি দিয়া বাড়ি
পালকি চরে যাইতে ছিল নিজের বাপের বাড়ি''
পুঁথি পাঠ শুনে মধ্য রাত্তিরে বাড়ি ফিরলাম।
গ্রামে বৃষ্টির পানিতে রাতে ব্যাঙ এর ডাক একটু শিহরিত করে তুলে। রাতে চোখ যতদূর যায় ছোট্ট ঘর গুলোতে কেরোসিনের বাতিতে নিভুনিভু করে জ্বলতে থাকা আলো।
রাতে ঘুমিয়ে গেলাম, সকলে বাহিরে হট্টগোলে ঘুম ভাংলো আমার।
নিলুর বর এসেছে হাতল চেয়ারে নিলুর বর বসে আছে অন্যপাশে মতি মিয়া একটা বসে আছে কাটের টুলে। নিলুকে নিতে চায়। মতি মিয়াকে অনেক কষ্টে রাজী করালো হট্টগোলে বুঝার বাকী রইলো না।
মতি মিয়ার গিন্নীর শরীরে অবস্থা ভাল না, ডাক্তারমশাই এর বড়ি কাজ করলো না। বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে না গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। ঐদিকে মতির ছোট ছেলেটার মেলায় যাওয়া, লাল শার্টের আবদার।
জামাই এসেছে তার সাথে মেলা! নিলুর আবদার জামাইকে উপহার দিতে হবে, বড় বাড়ীর ছেলে বলে কথা চল্লিশ পঞ্চাশ টাকা দেয়া কেমন দেখায় কম করে হলেও দুইশো টাকা উপহার দিতে হবে মেলার জন্য। নয় তো আবার মেয়েকে কথা শুনাবে কিংবা গায়ে হাত তুলবে।
মতি মিয়ে বিষন্ন হয়ে পুকুরপাড়ে বসে আছে।
-আলিম ধানি জমি খানেক মহাজনের ধারে কতো দাম পাইবাম?
-কম করে হলেও দুইশো/ আড়াইশ টাকা পাওয়া যাবে।
-আমার আর কোন উপায় নাই রে আলিম।
এক অভাগা বাবার আর কি সাধ্য থাকতে পারে! মতি মিয়া চলল মহাজনের নিকট। ধানি জমি বেচে মেয়ের জামাইয়ের উপহারের জন্য।
বাড়িতে আয়োজনের কমতি নেই চারদিকে পোলাও মাংসের ঘ্রাণ। নিলু সব আয়োজন করছে। অন্যদিকে নিলুর মা বিছানায় কাতরাচ্ছে।
মতি মিয়া ধানি জমি বিক্রি করে রাজপুত্তুর মেয়ের জামাইকে দুইশো টাকা উপহার দিলো, সেই খুশিতে জামাই খুশিতে মাতোয়ারা।
কোথা থেকে মতি মিয়ার ছোট্ট ছেলেটা দৌড়ে আসলো।
-আব্বা আমারে বৈশাখী মেলায় নিয়ে যাইবা?
-আইচ্ছা বাজান
-আমারে একটা লাল শার্ট কিইন্না দিবা?
মতি মিয়া চুপ হয়ে যায়, ধানি জমি বেচে জামাইকে উপহার দিয়ে অবশিষ্ট কিছু নেই যে। সন্তানের আবদার অভাগা বাবার যে ফেলা দেয়ার সাধ্য নেই। এই ছোট্ট অবুঝ ছেলেটাকে কি জবাব দিবে।
-আব্বা আমারে লাল শার্ট কিইন্না দিবা?
-বাজান তোমারে রোজার ঈদে সুন্দর দেইখা দুইডা লাল শার্ট কিইন্না দিবাম।
মতি মিয়ার ছেলে চলে গেল একটা শার্টের বদলে দুইটা শার্ট পাবে তাই হয় তো সে খুব খুশি।
মতি মিয়ার গিন্নীর শরীরটা খুবই খারাপ, জরুরি হসপিটালে নিতে হবে আমি একটা ভ্যান ডেকে আনি আমার কাছে অল্প কিছু টাকা আছে তা দিয়ে চিকিৎসা হয়ে যাবে। উপশহরের সরকারি হাসপাতাল অনেকটা দূর ভ্যানে দুই ঘন্টা সময় লাগতে পারে। নিলুর মায়ের শ্বাসকষ্টে ছটফট করছে খুব। আস্তে আস্তে নিলুর মা শান্ত হয়ে যায়। ঘুমিয়ে গিয়েছে সুন্দর করে।
ঘন্টাখানেক পর হসপিটালে পৌঁছলে ডাক্তার নিলুর মাকে মৃত ঘোষণা করে।
নিলুর বাবা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। কেন জানি লোকটা কান্না করছে না। একদম চুপচাপ হয়ে আছে। কাছের মানুষ মারা গেলে এতো চুপচাপ হয়ে যায় আমি আগে দেখি নি।
বুকের ভেতর কেমন জানি খালিখালি লাগছে।
লাশটা নিয়ে বাড়িতে ফিরলাম।
নিলুর ভাই অবুঝ বাচ্চাটা মায়ের পাশে দাড়িয়ে আছে। সে সবার মুখের দিকে তাকায় কেউ কিছু বলে না।
'বাবা তোমার মা ঘুমাচ্ছে।
-চাচা মা কে বলেন আব্বাকে কইতে, আমারে যেন মেলায় লইয়া যায়। আমার লাল শার্ট লাগবো না।
আমার চোখের কোনে পানি এসে গেলো। সেইদিন মাগরিব বাদ জানাজার পর দাফন করা হলো। জানি না মায়ের কথা জানতে চাইলে ছোট্ট ছেলেটাকে কি জবাব দিবে।
আজকের সকালটা থমকে আছে।
ঐদিকে নিলুর বর তারাহুরো করছে তাদের চলে যেতে হবে, তার জরুরি কাজ পড়ার অজুহাতে নিলুর বর প্রায় রেডি। নিলুকে তৈরী হতে বলতেছে।
নিলুর বর এবং নিলু মতি মিয়া অভাগা বাবাকে সালাম করে চলে যাওয়ার জন্য রওনা দিয়ে দিলো। ছোট্ট ভাইটা কলাপাতার বেড়ায় ধরে দাড়িয়ে আছে।
মতি মিয়া পলকহীন চোখে তাদের চলে যাওয়া দেখছে।
Comments