কাশফুল, ছোট গল্প। লেখা- নাসিম কবির

 'কাশফুল'

লেখা: নাসিম কবির


শরৎকালে কাশফুল গুলো অদ্ভুত সুন্দর হয়। ফেইসবুক টাইমলাইনে চোখ বোলালেই দেখা যায় কাশফুলের সামনে, পেছনে কিংবা আড়ালে মানুষ গুলো দাড়িয়ে আছে। অবশ্য মানুষ গুলো থেকে কাশফুলকেই বেশি মানায়।

আমি কখনো কাশফুল স্পর্শ করে দেখি নি কিংবা খুব নিকটেও না। তবে দূর থেকে দেখেছি। আমার আগ্রহের কমতি নেই। কোন এক সকালে পায়ে হেঁটে দিয়াবাড়ি যাবো কাশফুল দেখতে। আমার আগ্রহ চরম শিখড়ে।

ভাবতে ভাবতে কখন যে সিমেন্টর চেয়ারে ঘুমিয়ে গেলাম বুঝতেও পারি নি।

-এই যে শুনছেন

কানের একটা শব্দ আসলো। আওয়াজটা খুব মধুর কিন্তু বুঝতে পারলাম না। চোখ আবছা করে দেখলাম।

-কি ব্যাপার এই অসময়ে ঘুমাচ্ছেন?

একটা যুবতী মেয়ে দেখতে ছিমছাম চেহারা। দেখতে বেশ সুন্দর। যেভাবে কথা বলছে মনে হয় আমার পূর্বপরিচিত।

আমি ভেবাচেকা খেয়ে, পরিবেশটা সুন্দর। খোলা আকাশের নিচে শুয়ে থাকতে আমার পছন্দ তাই চোখে ঘুম আসার সুবাদে অল্প ঘুমিয়ে নিলাম।


মেয়েটা হয় তো বসতে চাচ্ছে আমি শুয়া থেকে ওঠে বসে গেলাম। মলিন চেহারায় আমার মাথায় চুল, মুখ ভর্তি দাঁড়ি। এ বয়সে এমনটা মানায় না। তবুও এমনভাবেই থাকি। অনেকের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়' এই বয়সে তুমি এমন কেন! বয়স আমার তেইশের আশেপাশে। মানুষের কথায় আমার কিছু যায় আসে না। একবার পকেটে টাকা না থাকায় দুই দিন খাবার না খেয়ে শুধু পানি খেয়ে ছিলাম। ক্ষুদার জ্বালায় বন্ধু মহলে টাকা চাওয়াতে তারা হরেক রকমের অজুহাত দিয়েছিল। অথচ ওরাই আমাকে কথাশোনাবে, তাতে আমি কিছু মনে করি না। আমার জীবনটা একান্ত আমার, কারো বাপের সম্পত্তি নয়।

দেখতে মলিন হলেও মনটা ভাল থাকে সব সময়।

মেয়েটা আমার পাশে বসলো, 

আমি প্রিয়ন্তি, আপনার নাম?

আমতাআমতা করে উওর দিলাম, অর্ণব। আপনাকে ঠিক চিনলাম না।

মেয়েটা কথা কাটিয়ে যাচ্ছিল, আইসক্রিম খাবেন?

না, ঠান্ডায় সমস্যা হয়।

চলেন যাই দিয়াবাড়ি, যাবেন?


কি অদ্ভুত ব্যাপার! আমি দিয়াবাড়ির কথা ভাবছিলাম তা কি করে জানলো। আর হঠাৎ করে অপরিচিত একটা মানুষের সাথে এতোটা ফ্রি হয় জানা ছিল না। ঘুম চোখে থ হয়ে আছি।


ওঠেন ওঠেন, আমাকে ছবি তুলে দিতে হবে কিন্তু


কিছু না ভেবে ওঠে গেলাম, কেমন যেন একটা অজানা টান আমাকে টানছিল। খুব রূপবতী তরুণী বলে কি এমন হচ্ছে! জানি না। আমার কিছু একটা বলা দরকার, পায়ে হেঁটে যাবেন?

এতদূর হাঁটতে পারবেন?


মেয়েটা কি আমাকে দূর্বল ভাবছে! কিছু না বলে ঠোঁটের কোনে হাসি দিলাম। মেয়েটা হয় তো বুঝে গিয়েছে। আমার সম্মতি আছে।

নারী সঙ্গ খুব অদ্ভুত, তখন না শব্দটাও হ্যাঁ তে পরিনত হয়।

আমার খারাপ লাগছে না। শহরের ব্যস্ততম রাস্তা পেরিয়ে কোলাহল মুক্ত রাস্তায় দুজন হাঁটছি। আজ আকাশটা মেঘলা। বৃষ্টি আসার সম্ভাবনা নেই। এমন সময়টা আমার বেশ লাগে। 


মেয়েটা হঠৎ করে, আপনি কি রেগে আছেন আমার প্রতি?

-না ঠিক আছে।

-হাত ধরবো?

কি হচ্ছে আমার সাথে আমি জানি না, হয় তো ভবঘুরে মনটা প্রিয়ন্তির প্রেমে ডুব দিবে। ইতিমধ্যে মেয়েটা আমার হাত ধরে হাঁটছে।

ভয় কিনা জানি না, বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে। কপালে ঘাম জমেছে।

ততোক্ষণে দিয়াবাড়ি এসে গেলাম বুঝতেও পারি নি। সময় খুব তাড়াতাড়ি চলে গেল। প্রিয়ন্তি নামের মেয়েটার সাথে পথচলাতে অনেক কথা হলো। মেয়েটা অদ্ভুত, সত্যি খুব অদ্ভুত।

একপর্যায়ে আমি হাসি আর ধরে রাখতে পারি নি। মেয়েটার ছোটবেলার গল্প শুনতে শুনতে। ছোটবেলার গল্প গুলো একটু বেশি মজার হয়।

যতদূর চোখ যায় শরৎের শুভ্রতায় চারপাশে কাশফুলের সাদা হাসি।

খুব কাছে থেকে দেখছি, সুন্দর খুব। সুন্দর নামে একটা শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা কম হয়ে যায়। এই সৌন্দর্যের বর্ণনার কথাটি আসলে কবি জীবনানন্দ দাসের কথা প্রথমেই মাথায় আসবে।


''বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি,

তাই পৃথিবীর রুপ খুঁজিতে যাই না আর''


আমি খুবই আপ্লূত। মনে মনে ভাবছিলাম প্রিয়ন্তিকে ধন্যবাদ দিবো কিন্তু  ধন্যবাদ দেয়াটা উচিৎ হবে না।

প্রিয়ন্তির ইচ্ছে ছিল ছবি তুলে দিবো তার মোবাইল দিয়ে কাশফুলের সাথে কিছু ছবি তুলে দিলাম। আমার ধারনাটা পাল্টে গেলো। কাশফুল অপেক্ষা প্রিয়ন্তিকে খুব ভাল লাগছে।

অনেকসময় হাঁটার ফলে গলাটা কাট হয়ে যায় পিপাসায়, প্রিয়ন্তি পানি হবে?

-হ্যাঁ

মেয়েটা সব সময় হাসিখুশি। পিপাসায় ঢকঢক করে বোতলের পানি শেষ করে দিলাম।

প্রিয়ন্তি বলল, অর্ণব চলেন ঐদিকে যাই।

-হ্যাঁ চলেন।


ঐদিকটা খুব সুন্দর। ঘন কাশঝোপে আরো সুন্দর লাগছিল। মানুষ কম থাকায় সৌন্দর্য গুলো আরো জীবন্ত হয়ে ওঠছে।

মাথাটা কেমন জানি ঝিমঝিম করছে। হয় তো তখন ঘুম হয় নি তাই।

 

-অর্ণব জায়গাটা খুব সুন্দর তাই না?

-হ্যাঁ বেশ


চোখে ঝাপসা দেখছি, সবকিছু যেন কালো হয়ে আসছে, প্রিয়ন্তি আমার হাতটা একটু ধরবেন?


ততোক্ষণে আমি কাশঝোপের ভেতর শুয়ে আছি। মাথার উপর বিশাল আকাশ। স্বপ্ন দেখলাম মনে হয়। কোথা থেকে প্রিয়ন্তি আসবে। কিন্তু আমি কাশঝোপে কেন! 

পকেটে হাত দিয়ে দেখি বিকাশ থেকে উঠানো পাঁচ হাজার টাকা এবং মোবাইল হাওয়া।

হাহা তবে প্রিয়ন্তি নামের মেয়েটা অনেক সুন্দর ছিল।

Comments

Popular posts from this blog