চাতক, ছোট গল্প। লেখা- নাসিম কবির

 'চাতক'

লেখা: নাসিম কবির


ইয়াসিন বয়াতি নতুন গান বেঁধেছে। আমাকে শুনাবে বলে আবদার করলো। ওনার কথাটা ফেলতে পারলাম না। চল্লিশ মিনিটের মতো অপেক্ষা করলাম। আমি বরং ওঠি। বয়াতি মনে হয় ভুলে গিয়েছে, আজ আর আসবে না। শিল্পীদের মন খুব রঙিন এবং মনভুলা হয়। বয়াতির মাথায় লম্বা জটলা পাকা চুল, মুখ ভর্তি গোঁফ-দাঁড়ি, মলিন পোশাকে যে কেউ দেখলে অস্বস্তিতে পড়ে যাবে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে রঙিন মানুষ। কতসুখ তার মনে। গানের সাথে হারিয়ে যায় অন্য এক জগতে। মাঝে মধ্যে একটা প্রশ্ন জাগে মনে। সেদিন বয়াতিকে প্রশ্নটা করেই ফেললাম, খাওয়ার বেলায় আপনার গোঁফের কারনে ত্যাক্ত লাগে না?

বয়াতি গম্ভীর হয়ে বলল, দুনিয়ার সকল কিছুই ত্যাক্তর জিনিস, সব হইলো উপরওয়ালার খেলা।

বয়াতির কথা বুঝা খুব মুশকিল, অর্থবোধক কথা গুলো মাঝে মাঝে মাথার উপর দিয়ে যায়।


আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, অনেক বাতাস। যে কোন সময় বৃষ্টি নামে যেতে পারে। আমি হাঁটছি গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে। একপাশে জঙ্গল অন্যপাশে খোলা মাঠ। তার মাঝে মধ্যে দু'একটা বাড়ি দেখা যায়। এইদিকে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। ততোক্ষণে আমি ভিজে একাকার। আমার পাঞ্জাবি বৃষ্টির জলে ভিজে শরীরে লেপ্টে আছে। দূর থেকে হেডলাইট জ্বালানো ইংরেজ সাহেবের জীপ আসছে, তাতে সন্দেহ নেই। এই রাস্তায় সাহেবদের জীপ, ঘোড়ার গাড়ি এবং গরুর গাড়ী ছাড়া অন্যকিছু দেখা যায় না। হেডলাইটের আলোতে মুষলধারায় বৃষ্টির ফোঁটা গুলো দেখা যাচ্ছিল। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, আশেপাশের বাড়িগুলোতে লন্ঠন জ্বলে ওঠলো। সন্ধ্যার পর ভেজা শরীরে আমার ছোট্ট ঘরে পৌছলাম। আজ অনেকটা সময় বৃষ্টিতে ভিজলাম। ঠান্ডা লাগার ভয়টা কাজ করছে। আমার গিন্নি থাকলে হয়তো এখন গামছাটা এগিয়ে নিয়ে এসে মাথাটা মুছে দিতো। গিন্নীরা স্বামীর প্রতি খুব যত্নশীল হয়। তাই হয় তো বৃষ্টিতে ভেজার কারনে মাথাটা মুছে দিতে দিতে দু'একটা বকা দিতো, কবে বুদ্ধিসুদ্ধি হবে আপনার। এমন বাদলা দিনে ছাতাটা নিলেও তো পারতেন। আশেপাশে কোথায় দাঁড়ালেও তো পারতেন। আপনাকে নিয়ে আমি আর পারি না। হাহা জানি না এই দিন কবে আসবে।


সাম্প্রতিক চাকরিটাও গেল আমার। একটা সংবাদপত্রে লেখালেখি করতাম, উপরমহলের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লেখায় তিনি চাকরি থেকে ছাটাই এর ব্যবস্থা করলো। পকেটে কানাকড়িও নেই। তাতে আমার কিছু যায় আসে না। চাহিদা নেই তেমন। এই পৃথিবীতে ছোট্ট ঘরটা ব্যাতীত আমার কিছুই নেই।

আমার শেওলা পড়া মাটির ঘরে আসবাব বলতে একটা চৌকি, চেয়ার-টেবিল। তাতে কিছু বই রাখা। একটা ছাত্র পড়াই বিনিময়ে তারা আমার খাবারের ব্যবস্থা করে। নাম অজয়।

চাকরির পয়সা দিয়ে আমি কি করবো। তাও চাকরির সামান্য কিছু পয়সায় কিছুটা বিলাসিতা করা যেতো।

গত সপ্তাহে জলপাইগুড়ি থেকে সুনির্মল ঠাকুর স্যারের একখানা চিঠি এসেছিল। স্যার বাবার জমিদারির দায়িত্ব ছোট ভাইকে বুঝিয়ে দিয়ে খুব সাধারণ ভাবে জীবন যাপন করছে। স্যার একটা ইস্কুলে শিক্ষকতা করে। শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় স্যার খুব ভাল বোধ করে। আমি স্যারের খুব পছন্দের ছাত্র ছিলেম। আমার কেউ ছিল না, আত্মীয় বলতে একটা বোন ছিল সেও কলেরায় মারা যায়। স্যার আমার জন্য একখানা চাকরির ব্যবস্হা করেছে। কিন্তু ময়মনসিংহ ছেড়ে অনেকটা দূর পাড়ি জমিয়ে জলপাইগুড়ি যাওয়ার আমার ইচ্ছে নেই। আমার চাকরির বেতনে কেনা জায়গায় ছোট্ট ঘরটাতে আমি বেশ ভাল আছি।


ভাবছি চিঠির উত্তরে স্যারকে কি বলবো, একপ্রকার গভীর শ্রদ্ধা থেকে স্যারের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার দুঃসাহস আমার হয় নি।

সন্ধ্যার সময়-ই গ্রাম নিরব হয়ে যায়। বৃষ্টি ভেজা রাতে ঝিঁঝিপোকা এবং ব্যাঙ এর ডাকে আমার একাকিত্ব আরো বাড়িয়ে দেয়। কেরোসিনের বাতিটা নিভু নিভু করছে। আজ মনে হয় বৃষ্টি থামবে না।

আমি চৌকিতে শুয়ে আছি। ক্লান্ত লাগছে খুব। ক্লান্ত শরীর কখন যে ঘুমে নেতিয়ে পড়লো বুঝতে পারলাম না। সকালবেলা পিয়নের ডাকে ঘুম ভাংলো। 

'মশাই আপনার চিঠি।

ঘুম চোখে চশমাটা চোখে দিয়ে চিঠিটা হাতে নিলাম। জলপাইগুড়ি থেকে বিন্তীর চিঠি। বিন্তী সুনির্মল স্যারের মেয়ে। খুব অবাক হলাম। এতোদিন পরও আমাকে মনে রেখেছে! তবে ভুলে যাবার কথাও নয়। তার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ দারুণ সখ্যতা ছিল। পড়াশোনা শেষ করে চাকরির সুবাদে আমি ময়মনসিংহে। চিঠিতে বিন্তি আমার জলপাইগুড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছে। জানি না এই অপেক্ষার মূলে কি রয়েছে। স্যারের চিঠিতে শুনেছিলেম বিন্তীর বিয়ে ঠিক হয়েছিল কিন্তু বিন্তীর হবু বর কলেরায় গত হওয়াতে বিয়েটা ভেঙে যায়। নিয়তির লিখন খণ্ডানো বড় দায়।


পিয়ন ঠান্ডা গলায় বলল, মশাই আজ বরং আমি আসি।

আমি হকচকিয়ে, দাদা বসেন, চিঠি পড়ার তালে আপনাকে খেয়াল ই করি নি।

না মশাই, আরো কিছু চিঠি বিলি করতে হইবে।

আচ্ছা ঠিক আছে দাদা।

পিয়ন বকশিস আশা করেছিল। কিন্তু পকেট ফাঁকা আমার। গরিব মানুষ বউ বাচ্চাদের মুখে তো খাবার দিতে হয়। অল্প মাইনে দিয়ে কি আর চলে। বকশিসে কিছুটা হলেও আর্থিক সহায়তা হয়।

যারা বিবাহিত, সন্তান আছে তারা টাকার জন্য যাই করোক না কেন তা পরিবারকে নিয়ে ভাল থাকার জন্য। গিন্নী, সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যই।

বাবা জাতিদের অনেক কষ্ট উপেক্ষা করেও চেপে যেতে হয়। কোন পিতা যখন সন্তানের আবদার পূরণ করতে না পারে তখন নিজেকে খুব ছোট মনে করে, জিন্দা লাশের ন্যায় পাথর হয়ে যায়।


ইয়াসিন বয়াতির গলা শুনতে পেলাম। লোকটা আমকে খুব পছন্দ করে। আমিও নেহাত কম নয়। মাঝেমধ্যে গানের আসর হয়। সেখানে অতিথি হয়ে উপভোগ করি। গানের গলা খুব পাকা। শরীরে একটা ভাব এসে যায়। 

ইয়াসিন বয়াতির একতারা, আরেকটা খমক নিয়ে এসেছে। হয় তো ঐ নতুন গানটা শুনাবে। আমি খমক বাজাতে জানি।

ইয়াসিন বয়াতি চুপচাপ বসে রইলো আমার ঘরের সামনে বকুল তলায় পেতে দেয়া মাদুরে। মাথা ঝুঁকানো অবস্থায় কিছু একটা ভাবছে। হঠাৎ করে বয়াতি, দুনিয়াটা রহস্যের জায়গা, আর আমরা সেথায় ঘুরপাকে শূন্যে যাচ্ছি।

খমড় ধরো, নতুন গানটা ধরি।


আমি খমক বাজাতে লাগলাম। বয়াতির গানে মনটা আন্দোলিত হয়ে ওঠলো, হারিয়ে গেলাম এক আজানা জগতে। গানটা শেষ হওয়াতে হারিয়ে যাওয়া মনটাকে টেনে বের করে বাস্তবতায় ফিরলাম। বয়তি আরো দুইটা গান ধরলো। স্নিগ্ধ বাতাসের গানে মুখরিত পরিবেশে বকুল গাছের ডালে দোয়েল পাখিটাও দোল খাচ্ছে।

গান এবং অদ্ভুত অদ্ভুত আলাপ করে ইয়াসিন বয়াতি চলে গেলো। নতুন গানটা অনেক ভাল হয়েছে।


অজয়কে বিকেলে পড়াই, কোন বিষয়ে সমস্যা হলে যেকোনো সময় নিয়ে আসে সমাধান করে দেই। চাকরি না থাকায় সারাদিন বই পড়ে কিংবা কখনো অজানা পথে পথ চলতে চলতে হারিয়ে যাই প্রকৃতিতে।

অজয়ের কথা ভাবতে না ভাবতেই অজয়ের বাবা হাজির। তিনি উত্তেজিত অবস্থায়, মাস্টারবাবু বড় বিপদ হয়ে গেল।

আমি খানিকটা অবাক হলাম, আপনি শান্ত হোন।

অজয় রাগ করে দরজা খুলছে না, আপনি চলুন। 

কি হয়েছে তার?

সাইকেলের জন্য রাগ করেছে। সকল চাহিদা মিটিয়েও ছেলেটাকে শান্ত রাখতে পারলুম না। 


অজয় জেদি ছেলে, সে হার মানার পাত্র না। আগামীতে মেট্রিক পরীক্ষা দিবে। ততোক্ষণে আমরা অজয়ের বাড়িতে পৌছালাম। অজয় ঘরে দরজা লাগিয়ে আছে। অনেক ডাকাডাকির পরও দরজা খোলছে না। তার বন্ধুরা এটা করেছে, ওটা করেছে অজয়েরও তা করতে হবে। বন্ধুমহলে সবার থেকে উপরে না থাকতে পারলে মানসম্মান জলে যাবে, নিজের মান থাকবে না। অজয়ের আবদার মেটাতে তার পরিবারের অনেক টানাপোড়েনে দিন যায়। এবার বায়না ধরেছে সাইকেল কিনে দিতে হবে। সাইকেল বর্তমানে চোখে দেখা যেন সোনার হরিণ দেখা। জমিদার এবং সাহেবদের ছাড়া সাইকেলের মালিকের সন্ধান কম ই পাওয়া যায়।


অনেক ডাকাডাকির পরও অজয় দরজা খোলছে না। এক পর্যায়ে দরজার খিল ভেঙে ঘরে ডুকে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। ছেলেটা এ কি করলো!

অজয় পাটের পাকানো দড়িতে ঝুলে আছে। একটা সাইকেলের জন্য আত্মহত্যা! 

দড়ি কেটে অজয়কে নিচে নামানো হলো ততোক্ষণে হৃৎস্পন্দন থেমে অজয়ের শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।

অজয়ের মা, বাবা ঘুম থেকে ওঠ। তোর জন্য আজই সাইকেল কিনে দেবো, ওঠ বাবা।

অজয়ের বোন দোয়ারে দাঁড়িয়ে কান্না করছে। অজয়ের বাবা কোন কথা বলছে না, কান্নাও করছে না। শুনেছিলাম ''অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর'' তেমনটাই হয়েছে।

আমি মনটাকে বুঝাতে পারছি না, ছেলেটা এভাবে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল।

বাড়িতে লোকজনের সমাগম, চারদিকে শোকের ছায়া নেমে পরলো। আমি ফিরে ভারাক্রান্ত মনে আমার ছোট্ট ঘরের চেয়ারটাতে হেলান দিয়ে একটু ভাবনার জগতে চলে গেলাম।


আমি কোন এক দ্বীপে একা আছি। বাহিরের দুনিয়া সম্পর্কে আমার তেমন কোন জ্ঞানও নেই। আমার নিজের গায়ের রং কি তা আমি নিজেও জানি না। হয় তো আমি পার্থক্য করতে পারতাম আমি কালো নাকি সুন্দর, যদি আমার মতো আরেকটা মানুষ থাকতো। তাই জানি না আমি দেখতে কেমন। 

বাস্তবিক অর্থে অমুকের এটা আছে ওটা আছে আমার কেন নেই! অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করতে ব্যাস্ত। কেন নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করতে হবে! উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের সমস্যা এমনই হয়। নিজেদের বন্ধু মহলে নিজেকে দারুণভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

মানুষ যদি নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা না করতো তাহলে মানুষ গুলো খুব ভাল থাকতো। অজয় এর মতো নিষ্পাপ প্রাণ গুলো নষ্ট হতো না। 

আমি বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব পড়েছিলাম, সেখানে বলা আছে- স্থান, কাল ও জড় বা ভর ধ্রুবক বা পরম কিছু নয় এগুলো আপেক্ষিক। হ্যাঁ সত্যি ই এমন।


মনটা ঘরে আর বসছে না। বুকের ভেতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে গেলো। শেষ বারের মতো অজয়কে একপলক দেখার স্বাদ জাগলো। 

শেষবারের মতো অজয়ের মুখখানি দেখে মনে হইলো, আমি তো খুব একা, মা-বাবা, বোন আত্মীয়স্বজন, কেউ নেই। না আছে অর্থ, না আছে অট্টালিকা, না আছে কিছু, আমি কেন আত্মহত্যা করছি না।

আমার যুক্তিতে জীবন একটাই। বর্তমানটা উপহার, হেরে না গিয়ে উপভোগ করাই শ্রেয়।


অজয়কে সৎকারের জন্য চিতা সাজানো শেষে মুখাগ্নি করা হলো। থমথম পরিবেশে অগ্নি দাহে অজয়ের দেহ মটমট শব্দ হচ্ছে। মানুষ পোড়া ধৌয়া আকাশে কুন্ডলী পাকিয়ে ওঠছে।

Comments