বিসর্জন লেখা: নাসিম কবির

 বিসর্জন

লেখা: নাসিম কবির
কালো মোটা ফ্রেমের চশমা চোখে রুপম চেয়ারের হাতলে কুনুই রেখে মাথায় হাত দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। আজহার দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, একটু এই দিকে আসবেন?
রুপম হকচকিয়ে ওঠলো, কি হয়েছে?
আহজার বলল, ''নুর ফিরে এসেছে''। রুপমের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠলো। বল কি!
রুপম এক হাতে লুঙ্গি অন্য হাতে চশমা ঠিক করে আজহারের পিছু হাঁটছে। খানিক দূরে চায়ের দোকানের টুলে নুর বসে আছে। হাতে অর্ধ পোড়া সিগারেটের ধৌয়া পাকানো হয়ে উপরে ওড়ছে।
রুপম নিশ্চুপ দাড়িয়ে আছে নুরের সামনে। নুর আধপোড়া সিগারেট রুপম দিকে এগিয়ে দিলো। তাৎক্ষণিক রুপম বলল, কোথায় ছিলে এতোদিন?
নুর মুচকি হাসি দিয়ে বলল, কোথায় আর থাকবো! এই তো ময়মনসিংহ জেলে বারো দিন, ঢাকা জেলে দুই মাস।
রুপম নুরকে বলল, তুই জেলে অথচ আমরা কেউ তোর খবর জানি না। সব জায়গায় তোর খোঁজ নিয়েছি।
নুর দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে বলল, কিছুই করার নেই রুপম।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। যেকোন সময় বৃষ্টি আসতে পারে। আজহার বলল, তাহলে আমি আসি, আমার একটা কাজ আছে। তা বলে আজহার চলে গেলো। নুর ওঠে দাঁড়াল, চল রুপম, আদার ব্যাপারী হয়ে একটু জাহাজের খবর নিয়ে আসি।
নুর বছরদুয়েক আগে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, সেখান হতেই জীবনের মোড় ঘুরে যায় তার। একের পর এক মামলা কিছুদিন জেল খেটে জামিনে ছাড়া পাওয়া এভাবেই চলছে তার। নুর নেতার ঘনিষ্ঠ সহচর। এবারের মামলা একটু অন্যরকম। নেতার হাতে মার্ডার হয়েছে বিরোধী দলের এক নেতা। নেতার খুনের দায়ভার নিতে হলো নুরের। নুরের ছোট্ট পরিবারে মাত্র তিনজন। স্ত্রী অনু এবং ছোট বোন রুপা অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।
নুর নেতার দিকে মাথা নিচু করে বলল, একটা কিছু করেন ভাই। মনে হচ্ছে ফেঁসে যাবো এবারের মামলায়।
নেতা হাসি দিয়ে বলল, আমি দেখতেছি ব্যাপারটা। নুর বলল, আর কতো দেখবেন? জেলে থাকতে ভাল লাগে না আর।
নেতা চেয়ার হতে ওঠে দাড়িয়ে বলল, যাও বাড়িতে যাও, কাল সকালে মিটিং আছে, চলে এসো। আমার কাজ আছে, পরে এ নিয়ে কথা হবে।
নেতা চলে গেলো। রুপম বলল, চল যাই।
রুপম নুরের ছোটবেলা বন্ধু। পোস্ট অফিসে চাকরি করে। বয়সের ভার পশ্চিমে হেলে পড়ছে তবুও বন্ধুত্ব নষ্ট হয় নি। নুরু মুখ গুমরা করে হাঁটতে লাগলো। রাস্তায় দেখা হলেই মানুষ একের পর একে সালাম দেয় নুরকে। সেটা কোন সম্মান হতে না, বলা যায় ভয়ে। নুরকে মানুষ ভয় পায়। কথায় আছে, শক্তের ভাক্ত নরমের জম।
নুর রুপমকে বলল, তুই যা তাহলে, শরীরটা ভাল লাগছে না। আমি কল দিলে দেখা করিস।
রুপম প্রস্হান করলো। নুর বাড়িতে ডুকতেই নুরের স্ত্রী ছুটে এলো, কোথায় ছিলে তুমি? নুরুের স্ত্রীর চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
-আরে বোকা মেয়ে কান্না করো কেন? কোথায় রুপাকে দেখছি না যে?''
-রুপা অসুস্থ।
-কি হয়েছ?
-তোমার নেতা এসেছিলো গতরাতে।
নুর তার স্ত্রীর চোখের দিকে তাকায়। অনুর চোখে পানি টলমল করছে। নুর নিশ্চুপ হয়ে বসে পড়লো। মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে।
চোখ নুরের গেলো অনুর হাতে এবং ঘাড়ে। বুঝতে আর কিছু বাকী রইলো না।
নুর বলল, অনু খাবার আছে ঘরে?
অনু বলল, হ্যাঁ আছে। গোসল করে এসো। আমি খাবার দিচ্ছি।
নুর গোসলে গেলো। বহুসময় ধরে বাথটাবে মাথা ডুবিয়ে রাখছে আবার তুলছে। অনেকবার অনু ডেকে গেলো কিন্তু নুর দরজা খুলছে না। একটার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে অট্টহাসি দিচ্ছে। নুর স্বাভাবিক হয়ে গোসল শেষ করে বের হয়ে আসে।
নুর অনুর দিকে তাকিয়ে আছে।
-কি দেখো?
-তোমাকে
খাবার খেয়ে ক্লান্ত শরীরে নুর ঘুমিয়ে গেলো৷ ভোরে ঘুম ভেঙে নুর শার্ট নিয়ে বেরিয়ে গেলো। রুমপের সার্কিট হাউসে নুর হাজির। রুপম অবাক হয়ে বলল, কিরে এই ভোর বেলা তুই? নুর মুচকি হাসি দিয়ে বলল, ঝরের তান্ডবের পর সূর্যকিরণ বরাবরই সুন্দর। সেই সূর্যকিরণ দেখার বাকী।
-মানে কি?
-একটা উপকার করতে পারবি?
-বল।
-নেতাকে একটা চিঠি পাঠাতে হবে। আগামী আট তারিখ। আমাদের ঝুপঘরের ব্যাপারটা মাথায় রাখিস।
-হাহাহা, ঠিক আছে। এখন যা, তোর নেতার মিটিং আছে।
নুর নেতার সামনে চুপচাপ বসে আছে। হঠাৎ নুর বলল, ভাই মিটিং কয়টায়?
নেতা হাজার পাঁচেক টাকা নুরকে এগিয়ে দিলে বলল, এগারোটায়। এটা খরচ করো।
নুর একটু মুচকি হাসি দিয়ে টাকা গুলো পকেটে রাখলো। মিটিং শেষে নুর বাসায় ফিরলো। অনু ঘরের কাজ করছে। নুর অনুকে বলল, আট তারিখ একটা দাওয়াত আছে আমাদের সবার যেতে হবে।
অনু কাজ থামিয়ে বলল, মেয়েটার ঐ শরীরে না যাওয়াই ভাল।
নুর বলল, গাড়ী ঠিক করা আছে, সমস্যা হবে না।
নুর বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ শ্বাস নিলো। চোখ লেগে আসছে। সারাদিন প্রচুর ধকল গেলো। অনু ডাকছে খাবার খাওয়ার জন্য। কিন্তু ওঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তবুও ওঠতে হবে। এখন পর্যন্ত না খেয়ে ঘুমাতে দেয় নি অনু।
নুর নেতার পাশে বসে আছে। ডাক পিয়ন চিঠি নিয়ে এসেছে। নেতা চিঠিটা এগিয়ে নিলো। মন্ত্রীর চিঠি, আট তারিখ গোপন মিটিং করতে চায়। নেতার মুখে আনন্দের ছাপ। যেন আমাবস্যায় চাঁদের দেখা পেলো। নেতা নুরকে সাথে যেতে হবে তা জানিয়ে দিলো। নুর মাথা নাড়িয়ে প্রস্হান নিলো।
পূর্নিমা রাত আজ, চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। নুর অনুকে বলল, শাড়ী পড়ে আসবা?
অনু অবাক হয়ে বলল, এতো রাতে শাড়ী!!
অনুর মুগ্ধতার চোখে অনুর দিকে তাকিয়ে বলল, হুম, যাও আমি অপেক্ষা করছি। জ্যোৎস্না রাতে তুমাকে নিয়ে হাঁটবো। অনু খুশি হয়ে শাড়ী পড়তে গেলো। নুর একটা সিগারট ধরিয়ে চাঁদকে ধোঁয়াটে করে দিচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পর ধোঁয়া কাটিয়ে চাঁদ হাসি দিচ্ছে। নুর চাঁদ-সিগারেটের লুকোচুরি খেলায় মত্ত।
আধঘন্টা পর অনু নীল শাড়ী পড়ে নুরের সামনে আসলো। নুর চোখ সরাতে পারছে না। আজ অনুকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে। নারী রুপের রহস্য উদঘাটন করা কোন পুরুষ পক্ষে সম্ভব না। এই মুগ্ধতার রহস্য রহস্যই থেকে যাক। নুরের ইচ্ছে হচ্ছে অনুর সকল ইচ্ছে পূরণ করতে।
নুর আনুকে বলল, তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।
অনু লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে।
নুর আবার বলল, চল হাঁটি। সামনের পুকুর ঘাটে বসি।
অনুর হাত ধরে নুর এগিয়ে যাচ্ছে।
খুব সকালে মোবাইলে কল আসলো৷ অনু মোবাইল এগিয়ে দিলো। নেতার কল ছিলো। নেতা নুরকে দ্রুত তৈরী থাকতে বলল। নুর অনুকে বলল, রুপাকে নিয়ে রেডি হয়ে থেকো। একটা কালো রঙের গাড়ী আসলে ড্রাইভার গন্তব্যে নিয়ে যাবে। নুর রেডি হয়ে বাড়ি হতে বের হয়ে যায়। চোখের কোনে পানি জমে আসছে নুরের। চোখ মুছে নুর ঝুপঘর হতে নেতার বাড়িতে গেলো।
গাড়ি রেডি নেতা বের হবে। নেতা নুরের হাতে কিছু টাকা দিলো, নুর তাড়াতাড়ি বের হতে হবে। ড্রাইভারকে বলো তাড়াতাড়ি আসতে।
নুর এবং ড্রাইভার অপেক্ষা করছে নেতার জন্য। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিরা দেরীতে আসতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।
একবার কোন এক অনুষ্ঠানে নেতার দাওয়াত ছিলো। তিনি এমন একসময় গেলেন তখন অনুষ্ঠান শেষ। অনুষ্ঠান বিহীন শূন্য জনসমাগম হতে ফিরে আসতে হলো।
নেতা বেরিয়ে এলো, ঝটপট গাড়িতে ওঠলো। সাথে নুর গাড়িতে ওঠে বলল, ড্রাইভার চলো। নুরের মোবাইলে রুপমের কল, হ্যালো নুর।
-হুম বল।
-ভাবি এবং রুপা চলে এসেছে।
-চা রেডি কর, আমরা আসতেছি।
রুপম হাসি দিয়ে কল কেটে দিলো। নেতার গাড়ি আঁকাবাকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছে। গাড়ির সিডি প্লেয়ারে গান বাজছে,
''মেরা দিল যে পুকারে আ জা
মেরে ঘাম কে সহারে আ জা
ভীগা ভীগা হৈং সমা
ঐসে মে হৈং তূ কহাঁ।''
নেতা হাত দিয়ে কিছু একটা ইশারা করছে, ড্রাইভার গান বন্ধ করে দিলো। নেতা রেগে গিয়ে বলল, শুয়োর গান বন্ধ করলি কেন? গানের সাউন্ড বাড়া।
ড্রাইভার হকচকিয়ে ওঠলো। অসহায় দৃষ্টিতে গানে সর্বোচ্চ সাউন্ডে দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো। নেতা পায়ের উপর পা তুলে দুলাতে থাকে।
ততোক্ষণে গাড়ি ঝুপঘরের সামনে চলে আসলো। নেতা এবং নুর গাড়ি হতে নামলো।
নেতা বললতে লাগলো, কি এক অদ্ভুত জায়গা!
নুর বলল, গোপন বৈঠকে এসব জায়গা ই ভাল।
নেতা বলল, হুম। ভেতরে ডুকা যাক।
নুর বলল, চলেন।
ঝুপঘরের ভেতর নুরের স্ত্রী, বোন, রুপম বসে আছে। নেতা ভেতরে ডুকে অবাক হয়ে নুরের দিকে তাকালো। নুর হাসি দিয়ে বলল, মন্ত্রী অনুর মামা সম্পর্ক হয়। যেহেতু তিনি এইদিকে আসবে তাই অনুকে তা জনিয়েছে। দেখা করতে বলল। আপনাকে তা জানানো হয় নি। নেতা ভ্রু কুঁচকে বলল, মন্ত্রী তোমার আত্মীয় আগে বলো নি তো।
নুর হাসি দিয়ে বলল, বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু বলা হয় নি।
হঠাৎ রুপম বলল, আপনাদের জন্য চা নিয়ে আসি।
নুর বলল, আমি চিনি খাই না।
রুপম চায়ের জন্য বেরিয়ে গেলো। নেতাকে বিচলিত লাগছে কিছুটা। নুরের স্ত্রী খানিকটা অবাক হলো, মন্ত্রী পদে আছে এমন কেই ওনার আত্নীয় নেই। নুর কেন তা নেতাকে বলল। নুর সবার সাথে গল্পে মশগুল। রুপা নেতার দিকে ঘৃণার চক্ষে একটু পর পর তাকাচ্ছে। ইতিমধ্যে রুপম চা নিয়ে হাজির। রুপম সবাইকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, পরিমাণ মতো চিনি মিশিয়ে নেন। নুর, এই নে তোর চিনি ছাড়া চা।
নুর চায়ে চুমুক দিলো।
নেতা, অনু এবং রুপা চায়ে চিনি মিশিয়ে চায়ে চুমুক দিলো।
চায়ে পটাশিয়াম সায়ানাইড মেশানোর জন্য কয়েক সেকেন্ড এর ব্যবধানে সবাই অজ্ঞান হয়ে গেলো। আশা করা যায় কয়েক মিনিট এর মাঝে মৃত্যু হবে।
নুর অট্টহাসি দিলো। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে রুপম এর দিকে তাকিয়ে নুর বলল, এই পৃথিবীতে মেয়ে মানুষ জন্ম নেয়াটাই ভুল। তাই না? অবশ্য তাতে নিজেদের হাত নেই। পৃথিবীটা আসলে একান্ত পুরুষের।
রুপম চুপ করে আছে। ততক্ষণে নেতা, নুরের স্ত্রী এবং বোনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়।
নুর পেছন হতে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল বের করে রুপমের দিকে তাক করলো। নুর বলতে লাগলো, রুপম আজ তোকেও নিরব করে দিবো, চারিদিকে খুব নিরবতা তাই না?
রুপম কাঁদো কন্ঠে বলতে লাগলো, ''আমাকে ভুলবুঝিস না, নেতা তোর বোনকে ধর্ষণ করেছে। অনুর দোষ ছিলো, আমি তাকে ধর্ষণ করি নি।'' রুপমের কথা শেষ না হতেই নুর ট্রিগারে চাপ দিয়ে দিলো। রুপমের কপাল ফুটো হয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
ঝোপঘরটা কিছু সময়ের ব্যবধানে নিরব হয়ে গেলো। নুরুের বুকের ওপর থেকে বড় একটা পাথর নেমে গিয়েছে। তাতে বুকটা শূণ্য হয়ে গিয়েছে।

নুরের হাতের পিস্তলটা মাটিতে পড়ে গেলো। নুর অনুর লাশের পাশে গিয়ে অনুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। নুরের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে থাকে। পাশে থাকা অনুর পটাশিয়াম সায়ানাইড মিশ্রনের চায়ের কাপে নুর চুমুক দেয়।

Comments

Popular posts from this blog