ছন্নছাড়া লেখা: নাসিম কবির
ছন্নছাড়া
লেখা: নাসিম কবির
হিজল গাছে পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভেঙে গেলো। জমিদার বাড়ির পুকুর ঘাটের সিমেন্টেরের চেয়ারে ঘুম ভেঙে অভি চুপচাপ বসে আছে। অন্যদিকে কোকিল ডাকছে। উপরে তাকিয়ে কোকিলকে দেখা গেলো না। কোকিলের কন্ঠ বেশ ভাল, তাতে চেহারা না দেখাই ভাল। বৈশাখ মাস প্রায় শেষের দিকে। এই সময় চারদিক অন্ধকার করে আসে ঝড়োবাতাসের সাথে বৃষ্টি হয়। অন্ধকার হবার মুহুর্তে কোকিলের ডাক শুনতে বেশ ভাল লাগে। আজ মাঝেমধ্যে সূর্য মেঘের জন্য ঢেকে যাচ্ছে। যেকোন সময় বৃষ্টি আসতে পারে।
জীর্ণ দেয়ালের পাশে তার প্রিয় কুকুর ঝিমাচ্ছে।
অভি রুটি ছিড়ে কুকুরকে বলল, নে খা। খুব কষ্ট করছস আজ। আমাকে সকালে ঘুম ভাঙাবি না একদম। কাল একদম ভাঙাবি না। আজ সারারাত জ্যোৎস্না দেখবো।
অভির কথা শুনে কুকুরটা পা সামনে বাড়িয়ে লেজ নাড়াচ্ছে।
তা সম্মতির লক্ষন। সকালে কুকুর কোথা হতে রুটিটা কামড় দিয়ে অভির মাথার কাছে রেখে মুখ দিয়ে ঠেলে অভিকে ওঠালো। বিরক্ত হয়ে অভি হিজল গাছের নিচে ঘুম দিলো। এখন ঘুম ঠিকমতো হলো। কুকুরটার জন্য অভির আহারের খানিকটা জুটে। বাকীটা কোনভাবে হয়ে যায়, আল্লাহর দুনিয়ায় দু'বেলা আহারের পরিমাণ খাবার নগন্য। খাবারের জন্য কেউ মরে না, মরে রোগে-শোকে।
অভি বিপিটি পাশ করে ইন্টার্নি সাম্প্রতিক শেষ হলো। কিন্তু মনে হচ্ছে জীবনের বিশেষ একটা অংশ বাস্তবতার আড়ালে চাপা পড়ে আছে। মানুষ টাকা, ক্ষমতা, মায়ার পেছনে পড়ে থেকে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে কিন্তু তা অভিকে টানে না। মিথ্যের মায়াজালে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। মোবাইল, মানিব্যাগ অবশিষ্ট যা টাকা ছিলো তা আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে। থাকার মধ্যে রয়েছে তাবু, ব্যাগে কিছু কাপড়চোপড়, সাথে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র। কিছুদিন ধরে সুকুমার রায়ের জমিদার বাড়ির জীর্ণ ভাঙা বাড়িতে আছে। চাহনির একতৃতীয়াংশতেই আকাশ দেখা যায়।
মানুষ মলিন পোশাককে এতোটা পাত্তা দেয় না। যে যার মতো পথচলে। অনেকে পাগল ভেবে এড়িয়ে চলে। অনেকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে৷ অভি বেশ ইন্টারেস্টিং মানুষ। মানুষের ভাবনার মতোই আচরণ করে। কখনো পাগল, কখনো পান্থ, তাতে দিন বেশ চলছে। গায়ে ধুলাবালি মাখানো অবস্থায় ক্লান্ত শরীরে পছন্দের কুকুরের শরীরে মাথা দিয়ে ঘুমে ঘন্টারপর ঘন্টা কেটে যায়।
মাথার উপর ছাদের ভাঙা অংশে ঝুলে থাকা বটমূলে বাদুড় ঝুলে আছে। হালকা বাতাসে দুল খাচ্ছে তা। চোখ পড়তেই অভির গায়ে কাটা দিয়ে ওঠলো। মাঝেমধ্যে রাতে বাদুর ডানা ঝাপটায়, বাদুড় খুবই অপছন্দের প্রাণী। মাকড়শা, বাদুড় থেকে পালিয়ে বেড়ায় ছোটবেলা হতেই। অভি দাড়িয়ে কুকুরকে বলল, চল বকুল তলায় যাই।
অভির ভয় কাজ করতেছে কখন জানি বাদুড় মুখের উপর ঝাপটে পড়ে৷ তা খুবই অস্বস্তিকর ব্যাপার। অন্যথায় অন্যকিছুতে ভয় কাজ করে না।
অভি জনমানবহীন রাস্তায় হাঁটছে। সাথে কুকুরটা পিছু পিছু আসছে। আকাশে মেঘ জমেছে খুব, ঝড়ো বাতাসে মেঘ গুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। কালবৈশাখী ঝড় হুটহাট শুরু হয়। যে কোন সময় বর্ষণ শুরু হতে পারে।
অভি হেঁটে যাচ্ছে অশোক গাছের নিচ দিয়ে, রাস্তার পাশের গাছটায় থোকা থোকা অশোক ফুলে সজ্জিত। গাছটা দেখতে ঝোপের মতো ছেয়ে আছে। অভি হঠাৎ অশোক গাছটার নিচে থেমে দাঁড়ালো। চোখের সাথে মনটাও কেড়ে নিলো অশোক গাছটা। অভি উপরের ফুলের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে, আহ্ কি মিষ্টি ঘ্রাণ।
আগে কখনো এতো মুগ্ধ হয়ে ফুল দেখে নি অভি।
হঠাৎ টুপটাপ বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা পরছে অভির মুখে। তাও চোখ খুলছে না। গায়ে পাঞ্জাবি শরীরে সাথে বৃষ্টির পানিতে লেপ্টে লেগে আছে।
কুকুরটাও উপরের দিকে মুখ তুলে আছে, তাতে বৃষ্টিতে কুকুরটার পিট বেয়ে ফুটাফুটা পানি নিচে গড়িয়ে পড়ছে।
কুকুরটা বেশ রোমান্টিক, সেই সুবাদে মহিলা কুকুরের পাল্লায় পড়লে মুশকিল।
অভি স্বাভাবিক হয়ে বলল, চল যাই। বৃষ্টি হয়ে ভালই হলো, ভেজা বকুল তলে বৃষ্টি বিলাস মন্দ হবে না। বাতাস এবং বৃষ্টির পানিতে বকুল ফুলের ঘ্রাণ আরো প্রকট হবে।
অভি আর কুকুর ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অভি ভাবছে আজ জ্যোৎস্না দেখা যাবে না। তবে যদি বাতাস থাকে তাহলে মেঘ ভেসে বেড়াবে। সেই সময় আকাশটা অদ্ভুত সুন্দর হয়ে ওঠে। ইচ্ছে হয় আহার-পানাহার ব্যাতীত চেয়ে থাকি মাসের পর মাস। বকুল গাছের নিচে অভি ভেজা ঘাসে শুয়ে আছে, পাশে কুকুরটা অভির পেটে মাথা রাখলো। অভি এক হাত নিজের মাথার নিচে দিয়ে অন্য হাতে কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কয়েকটা ঝড়া বকুল অভির মুখে পড়লো।
অভি ভাবছে স্থান ত্যাগ করতে হবে। কুকুরটার প্রতি অদ্ভুত মায়া কাজ করছে। জমিদার বাড়ির ছাদের ভাঙা অংশ দিয়ে রাতে মেঘে ঢাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে ভাবতে অভি ঘুমিয়ে গেলো।
সকালের সূর্যের কিরণে অভির ঘুম ভেঙে গেলো। পাশে কুকুরটা ঘুমাচ্ছে। অভি কুকুরের গায়ে হাত বুলিয়ে বিদায় নিয়ে ব্যাগ কাঁধে হেঁটে চলল অজানা পথে। সবুজ ধানক্ষেত গুলো মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে। ফিঙ্গে পাখিরা ধানক্ষেতের উপর দিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, কখনোবা গাঙ শালিক। চড়ুইয়ের ঝাঁক ধান খেয়ে যাচ্ছে। চোখ জোড়ানো সৌন্দর্য দেখতে দেখতে অভি পথ চলছে।
দূর হতে একজন হাত ইশারা করছে অভিকে। অভি আস্তে আস্তে সামনে গেল।
লোকটা বলল, ভাই বস্তাটা ইকটু আংগাইয়া দেইন।
অভি আলুর বস্তাটা ধরে গাড়িতে তুলে দিলো।
লোকটা বলল, আম্নের বাড়ি কই? কই যাইবাইন?
অভি বলল, বাড়ি নেই; গন্তব্যও নেই।
লোকটা ভ্রু কুচকুচে বলল, আমার বাড়িত কাম করবাইন?
অভি নিঃসংকোচে বলল, ঠিক আছে।
লোকটা দু'পাটি দাঁত বের করে হাসি দিলো। আধাপাকা দাঁড়ি নড়ে ওঠলো। এ বয়সের মানুষদের সৌন্দর্য বেড়ে যায় হয় তো দাঁড়ির জন্য। লোকটার নাম আলাল ব্যাপারী।
আলাল ব্যাপারী বলল, তাইলে গাড়িত উঠুইন। বাজার ধরতে হইবো। সূর্য্য ওইঠা পড়তাছে।
আলাল ব্যাপারী পিকআপ ভ্যান চালাচ্ছে, তার পাশের সিটে অভি বসে আছে। আলাল ব্যাপারী একের পর এক পান খাচ্ছে, খানিক পর পর জানালা দিয়ে পানের পিক বাহিরে ফেলছে।
ঠোঁট দু'টো রক্তিম লাল হয়ে আছে।
আলাল ব্যাপারী বলল, গাড়ি চালাইতে পারুইন?
অভি বলল, না; শেখা হয় নি এখনো।
আলাল ব্যাপারী পান চিবাতে চিবাতে বলল, ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন মাঠে নামাইছি। দেখাইয়া দিলে পারবাইন।
অভি বলল, পারবো ইনশাআল্লাহ।
দু'জন কথা বলতে বলতে আরতে চলে আসলো। সবজি বিক্রি করে অভিকে নিয়ে আলাল ব্যাপারী বাড়ি ফিরলো। বাংলা ঘর পরিষ্কার করে দিলো অভির জন্য। অন্যদিকে হারভেস্টার মেশিন চালানো অভি শিখে গিয়েছে। হাওরের অনেক জমির ধান কাটলো মেশিনের মাধ্যমে। কয়েক বিঘা জমির ধান কাটা যায় কিছু সময়ের ব্যবধানে। দিনমজুরের পেটে লাথি মারছে হারভেস্টার মেশিন। তাতে অভির খারাপ লাগা কাজ করে। আলাল ব্যাপারী কৃষকের নিকট হতে নির্ধারিত মূল্য হতে বেশি টাকা নেয়। অমানবিক ব্যাপার। অভি আলাল ব্যাপারী হতে কোন বেতন নেয় নি। অর্থ অনর্থক। অভি জায়গা পরিবর্তনের চিন্তা করে।
অভি বিদায়ের চিরকুট লিখে, তার উপর হারভেস্টারের চাবি রেখে বেড়িয়ে পড়লেন রাস্তায়। একটু সামনে রেললাইনের ধরে হাঁটতে হাঁটতে সন্ধা ছুঁইছুঁই ততোক্ষণে রেলস্টেশনে পৌছালো। খুব ক্লান্ত লাগছে। ব্যাগে কিছু শুকনা মুড়ি ছিলো, রেলস্টেশনের সিমেন্টের চেয়ারে বসে অভি মুড়ি খাচ্ছে। পানি খেয়ে সেখানেই শুয়ে পড়লো। চোখটা লেগে আসছিলো, হঠাৎ এক নারী কন্ঠে অভি জেগে ওঠলো।
'এই যে শুনছেন?'
অভি হকচকিয়ে শুয়া অবস্থা হতে ওঠে বসে পড়লো।
মেয়েটা পুনরায় বলল, কি অদ্ভুত! মানুষ বসতে পায় না; আর আপনি শুয়ে আছেন কেন?
অভি বলল, দুঃখিত।
ছিমছাম, লম্বা মেয়েটা দেখতে অপরূপ সুন্দরী, বাতাসে চুল গুলো উড়ে মুখে আসছে। তা আবার হাত দিয়ে মেয়েটা সরিয়ে দিচ্ছে। অভি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
মেয়েটার বাহ্যিক রূপ অসাধারণ কিছু নয়। কিন্তু মেয়েটা একটু চেহারার জন্য নিজেকে অহংকারী ভাবে জাহির করলো। সৃষ্টিকর্তা যদি চেহারার পরিবর্তনের ব্যবস্থা রাখতো, তাতে চেহারা পরিবর্তন করতে মেয়েটা যদি কোটি টাকা খরচ করতো তাহলে সেই অহংকার মানাতো। হাইস্যকর লাগছে। অভি মুচকি হাসি দিলো।
মেয়েটা অভির দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত অবস্থায় চেঁচামেচি করে বলল, কি আজিব প্রাণী! এখানে হাসির কি আছে?
অভি কোন উওর না দিয়ে প্রস্থান করলো। মেয়েটা তাকিয়ে অভির চলে যাওয়া দেখছে।
অভির যোগ্যতা আছে কিন্তু পোষাক ভাল না। পরিপাটি পোষাককে মানুষ সম্মান করে। দর্শনের পর মানুষের যখন কোন যোগ্যতা থাকে না তখন অপর পৃষ্ঠের মানুষ গুলো থেকে অবহেলা পায়। বিশেষ করে গরিব, রাস্তায় থাকা মানুষগুলো। এই বৈষম্য কখনো শেষ হবে না। অনেক সময় দেখা যায় পাঁচ টাকা বেশি ভাড়ার জন্য বয়ষ্ক রিকশাওয়ালার গায়ে তুলতেও দ্বিধা করে না।
ট্রেন চলে আসলো অভি জানে না তার গন্তব্য কোথায়। অভি ট্রেনে ওঠে গেলো। ট্রেনের আসন বেশ ফাঁকা। ৪৫ নং সিটে বসে আছে অভি।
মিনিট দুয়েক পর ঐ মেয়েটা অভির সামনে দাঁড়ানো। মেয়েটা বলল, আপনি এখনে! (মেয়েটা রাগে ফুঁসছে) আমার সিট নাম্বার ৪৬
অভি মেয়েটার মুখের দিয়ে তাকিয়ে বাহিরের দিকে মনযোগ দিলো। মেয়েদের কথায় হাসিমুখে উত্তর দিলে ভাববে সুযোগ নিচ্ছে। এই নিয়ম বড়ই অদ্ভুত যদি পরিচিত কেউ দেখে তাহলে ভাববে ভালবাসার সম্পর্ক মেয়েটার সাথে।
অভি বিরবির করে একটা গান ধরলো।
অভির গান শুনে মেয়েটা আরো তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠলো
মেয়েটা বলা শুরু করলো, আপনার সমস্যা কি?
অভি বলল, কোথায় সমস্যা মনে হচ্ছে?
মেয়েটা বলল, বিরক্ত করছেন কেন?
অভি চুপ করে ট্রেনের জানালা দিয়ে চাঁদের দিকে তাড়িয়ে আছে, ট্রেন চলছে দূর হতে দেখা যায় গ্রামে হারিকেন জ্বলছে। পূর্ণিমা রাতের চাঁদের আধো আলোতে পাশের গাছ গুলো দেখা যাচ্ছে। মেয়েটার প্রতিক্রিয়ায় অভি কিছু মনে করছে না। তুচ্ছ বিষয়ে না ভাবাই উত্তম।
মেয়েটা খানিক চুপ থেকে একটু নরম হয়ে অভিকে বলল, কোথায় যাবেন?
অভি অনেকটা অবাক হয়ে গেলো, 'জানি না, ট্রেন কোথায় নিয়ে যায়'
মেয়েটা বলল, 'আপনি একটু অদ্ভুত, স্টেশনেই থাকেন?'
অভি বলল, 'যেখানে রাত হয় সেখানেই থাকি'
মেয়েটা আবার প্রশ্ন করলো 'কি করেন আপনি?'
অভি ভাবলো ব্যাপারটা ক্লিয়ার করা দরকার। মেয়েটা রাগের বলি হবার ইচ্ছে হচ্ছে না। অভি বলল, আমি বিপিটি চিকিৎসক। ইন্টার্ন শেষ করে গন্তব্যহীন মানুষ হয়ে গেলাম।
মেয়েটা অভির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু বলার শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। হয় তো অভির কাছে মেয়েটা লজ্জিত। পেশা দিয়ে মানুষ বিচার করা মানুষ গুলো যতোই সুন্দর হোক না কেন মানুষের মূল্যায়ন করতে জানে না।
অভি পুনরায় জানালা দিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। হয় তো ট্রেনে থাকা উচিৎ হবে না ভেবে অভি পরবর্তী স্টেশনে নেমে গেলো।
রেলস্টেশন প্রায় নিরব, মধ্যরাত প্রায়। বিশ-পঁচিশের মতো মানুষ ঘুমাচ্ছে। অভি ব্যাগ হতে পাতলা ফ্লোর মেট বিছিয়ে শুয়ে আকাশ দেখছে। রাত গভীর হলে প্রকৃতির মায়া খুব তীব্র হয়ে ওঠে। খুব ভোরে অভির ঘুম ভেঙে যায়। ব্যাগ হতে ম্যাপ বের করলো ত্রিশ কিলোমিটার পাড়ি দিলে গারো পাহাড়ের নিকট যাওয়া যাবে। অভি হাঁটছে গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে। খুব খিদে পেয়েছে। খানিকটা দূরে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। একটা কুঁড়েঘর, ঘরের ছাউনিও ছনের।
কলাপাতার বেড়ার সামনে দাড়িয়ে অভি বাড়িতে হাক দিলো, আমি খুব ক্ষুদার্ত। আমার জন্য খাবার হবে?
বাড়ির ভেতর হতে বৃদ্ধা কন্ঠে সাড়া দিলো, বাড়ির ভিতরে আইয়্যুইন।
অভি স্বস্তির চাহনিতে বাড়ির ভেতর ডুকলো। গ্রামে খাবারের জন্য কেউ কাউকে ফেরায় না।
বৃদ্ধা মহিলাটা একাই থাকে, এক ছেলে আছে শহরে ভাল চাকরি করে কিন্তু মায়ের খোঁজ নেয় না। বৃদ্ধা খুব কষ্টে জীবনযাপন করছে, ওনার চোখের ক্লান্তির ছাপ।
কথা বলে কিছু সময়ের মধ্যে বৃদ্ধার কাছে অভি খুব আপন হয়ে গেলো। বেলা গড়িয়ে আসছে। বৃদ্ধা হতে বিদায় নিয়ে অভি উওর দিকে হাঁটতে থাকে। ততোক্ষণে সূর্য অস্তমিত। অভি এক অরন্যের ভেতর তাঁবু টানালো। মানুষের সংস্পর্শে হতে অরন্যে থাকা উত্তম। চাঁদের আধো আলোতে অভি কিছু লাকড়ি যোগাড় করে তাঁবুর পাশে ক্যাম্প ফায়ারের ব্যবস্থা করলো। তাতে ভিন্ন প্রাণী হতে রক্ষা পাওয়া যায়।
অভি নিভু নিভু আলোতে ডায়েরি লিখছে বসে। মাথার উপর চাঁদের আলোতে রাতটা আরো সুন্দর হয়ে ওঠলো। অন্যদিকে ঝিঁঝিপোকার ডাক। বৃষ্টি হলে হয় তো ব্যাঙ ডাকতো। ব্যাঙের ডাক শুনতে বেশ লাগে।
অভির তাঁবু ভেতর শুয়ে আছে, অন্য দিয়ে আকাশে বিদ্যুৎ চমকিয়ে বর্ষণ শুরু হলো। আল্লাহ মনের কথাটা শুনলো। ক্যাম্প ফায়ারের আগুন নিভে ধৌয়া ওঠছে। তাঁবু ওয়াটার প্রুফ হওয়ায় সেই সুবাদে পানি ডুকে নি। টুপটাপ বৃষ্টিতে অভির চোখ লেগে গেলো। ব্যাঙ এর ডাকে অভির ঘুম ভেঙলো। দূর হতে ফজরের আজানের শব্দ আসছে।
অভি খোলা আকাশের নিচে নামায পড়ে তাঁবু গুটিয়ে ভোরের অন্ধকারের হাঁটা শুরু করলো। বাতাস বইছে অনেক। হাঁটতে মন্দ লাগছে না।
রাস্তার দু'পাশে ছোটছোট বাড়ি সেথায় গারো এবং হাজং সম্প্রদায় বাস করে।
পাহাড়ি আঁকাবাকা পথ ধরে একলোক হেঁটে আসছে। অভিকে দেখে লোকটা থেমে দাঁড়ালো, চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ। লোকটা বলল, বাজান কই যাইবা?
অভি বলল, পাহাড়ে যাবো।
ওনি বলল, পশ্চিম পাশে যেয়ো না।
কারন জানতে চাইলে লোকটা কিছু বলছে না। লোকটা চলে গেলো। অভি অবাক হচ্ছে না, অভির হারানোর মতো কিছু নেই। টাকা কিংবা দামি জিনিস মানুষে শান্তিতে থাকতে দেয় না। পকেটে দামী মোবাইল এবং অনেক টাকা থাকলে পথ চলতে ভয় কাজ করে। কখন জানি ছিনতাই কিংবা পকেট মারের খপ্পরে পড়তে হয়।
অভি হাঁটছে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে খানিকটা হেঁটে গারো পাহাড়র পাদদেশে চলে আসলো। পাহাড়ের উচ্চতা বেশ। উপরে তাঁবু টানালে মন্দ হবে না। গারো পাহাড় হতে একশত মিটার পর ইন্ডিয়া বর্ডার। গারো পাহাড়ের উপর হতে ইন্ডিয়ার মেঘালয় রাজ্যের পাহাড় গুলো দেখা যায়। অভির চোখ জুড়িয়ে গেলো। পশ্চিম পাশটা দেখতে বেশ সুন্দর কিন্তু লোকটা যেতে মানা করেছিলো। তাতে কি ছিনতাই কবলে পড়লেও অভির থেকে নেয়ার কিছুই নেই।
অভি পশ্চিম দিকে হাঁটতে শুরু করলো। দুইটা টিলাকে উপেক্ষা করে অভি এগিয়ে গেলো। অনেকটা ঝোপঝাড় হয়ে আছে। সব সৌন্দর্য এখানে ঘিরে আছে। হঠাৎ পাঁচ-ছয় জন লোক অভিকে দেখে কিছু একটা ফেলে দৌড়ে পালাল।
অভি অবাক হয়ে বলল, কে? কে?
পেছন থেকে একটা গুলির আওয়াজ আসে। অভি ঘুরে দাঁড়ালো। দেখলো লম্বা একটা লোক লম্বা আলখাল্লা পড়া মাথায় ক্যাপ। হাতে পিস্তল। ততোক্ষণে অভির হৃদপিণ্ড বরাবর প্রচন্ড এক ধাক্কা খেলো। বুকের এক পাশ থেকে রক্ত অভির সাদা টিশার্ট লাল হয়ে যায়। অভি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, কিছুক্ষণের মধ্যে অভির প্রাণ পাখি মুক্ত হয়ে যায়।
Comments