অপ্সরা লেখাঃ নাসিম কবির

 'অপ্সরা'

লেখাঃ নাসিম কবির
অভি খোলা আকাশের নিচে সিমেন্টের চেয়ারে শুয়ে আছে, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত বারোটা বাজতে চলল। কাজ না থাকলে সময় জ্ঞান রাখা উচিৎ না। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে পশ্চিম আকাশে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। অন্যদিকে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে।
অনেকে বলাবলি করতে শুনা যায় এই চেয়ারে গভীর রাতে জ্বীন বসে বিশ্রাম নেয়। জ্বীন জাতীর কি বিশ্রামের জায়গার অভাব যে এখানেই বসতে হবে! তারা থাকবে গাছে, বন-জঙ্গলে, নির্জনে। কোন দুঃখে তারা এখানে বসতে আসবে।
চব্বিশ বছর বয়সেও কখনো জ্বীনের দেখা না পাওয়া মন একদম এসব ভয়ে সায় দেয় না।
অভির চোখ লেগে আসছে, মিনিট পাঁচেক পর অভি ঘুমের অতলে হারিয়ে যায়।
রাত প্রায় তিনটা বাজে। সুঘ্রাণে অভির ঘুম ভেঙে গেলো। মাথার নিচে বালিশ, তা হতেই সুঘ্রাণ আসছে। অভি ওঠে বসে গেলো। বালিশ আসলো কোথা হতে। ঘুমে মাথা ভার হয়ে আছে। এতো ভাবার সময় নেই, আবার ঘুমিয়ে নেয়া যাক। অভি আবার ঘুমিয়ে গেলো।
ভোরে পাখির কিচিরমিচিরে অভির ঘুম ভাংলো কিন্তু মাথার নিচে বালিশ নেই। তা কি ভ্রম ছিলো, নাকি সত্যি। হয় তো ভ্রম, তার কারণও বিদ্যমান আছে। সাম্প্রতিক অভির মায়ের আকষ্মিক মৃত্যু হয়, প্রিয়জন চলে যাবার কষ্টের তীব্রতা খুব বেশি হয়। মানষিক চাপের জন্য ভ্রম হতে পারে।
খুব বেশি খিদা লেগেছে, কিন্তু খাবারের ব্যবস্থা নেই। মা বেঁচে থাকলে তার চিন্তা করতে হতো না। রাতে বাহিরে ঘুমানোও হতো না। অভির বাবা পাঁচ বছর আগে গত হয়েছেন।
অভি ঘুম চোখ মুছে রুমে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। টেবিলে সাজানো খাবারের ডিশ। বাহারি খাবারের আয়োজন কিন্তু এই অসময়ে কে এতো আয়োজন করবে। এতটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় খাবার গুলো অভির জন্যই। কে আয়োজন করলো তা এখন দেখার বিষয় না। খিদা নিবারণ মুখ্য বিষয়।
অভির খাওয়া শেষ পর্যায়ে। পাশে মোবাইলে কল বাজতেছে। অপরিচিত নাম্বার মনে হচ্ছে। অপরিচিত নাম্বারে আসলে কম ই ধরা হয়। কারন অভি কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি না। তার তেমন কাউকে প্রয়োজন নেই। মূল্যহীন একটা মানুষ। খাওয়াদাওয়া শেষ করে কল ধরা যাক।
মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। হয় তো মা বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করতো রান্না কেমন হইছে? এই খাবার মুটামুটি হলো। কিন্তু মায়ের রান্নার সাথে তুলনা হয় না। মায়ের রান্নায় ভালবাসা থাকে কিন্তু অন্য কারো রান্নায় তা অনুপস্থিত। তাই মায়ের রান্না ভালবাসি অথচ আজ মা বেঁচে নেই। কল বেজেই চলছে অভি চোখ মুছে হাত ধুয়ে কল রিসিভড করলো।
"আসসালামু আলাইকুম''
অপর প্রান্ত হতে, ''ওয়ালাইকুম সালাম, অভি বলছো?''
''জ্বী, আপনি কে বলছেন?''
''আমি আজহার, তুমার মামা হই''
''ওহ, আমি আপনাকে চিনলাম না।''
''তোমার জহুরা নানুর ছোট ছেলে আমি''
অভি ভেবাচেকা খেয়ে গেলো। জহুরা নানু নামে এমন কেউ আছে মা কখনো বলে নি। আর ওনি নাম্বারইবা পেলো কোথা হতে।
অভি একটু চুপ হয়ে বলল, ''ও আচ্ছা, তো কেমন আছেন?''
''হ্যাঁ ভাল আছি, তোমার মায়ের চলে যাওয়ার সংবাদ পেলাম, খুব ভাল মানুষ ছিলো''
''দোয়া করবেন''
''তো ভাগিনা আমি তোমার বাড়িতে ঘন্টাখানেক পর আসতেছি''
''ঠিক আছে''
অভি রীতিমতো অবাক। এমন একটা মানুষ চেনাজানা নেই হঠাৎ কল দিয়ে বলতেছে আসতেছি। নানা অদ্ভুত মানুষের বসবাস এই ছোট দেশে।
টিনের চালে ঘুরিঘুরি বৃষ্টি পড়ছে। ঝিরঝির বৃষ্টিতে ঘুম বেশ জমে। অনেক খাওয়াদাওয়া হলো, এবার ঘুম দেয়া যাক। আজ রাতে পাঁচগাওয়ে গানের আসর হবে। ইয়াসিন বয়াতি আসার সুবাদে যাওয়া হবে। সেখান থেকে ফিরতে খুব রাত হবে। গহীন রাতে নির্জন পথ চললে নিজেকে নির্জনতার অংশ হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করা যায়।
অভির চোখ ঘুমের ঘোরে হারিয়ে যায়। হঠাৎ বাহিরে এক আগন্তুকের হাকে অভির ঘুম ভেঙে যায়। চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে অভি দরজার খিল খুলে বাহিরে গিয়ে দেখে বয়ষ্ক এক লোক হাতে ছাতা নিয়ে দাড়িয়ে হাসছে।
অভি বিরক্ত হয়ে বলল, ''কে আপনি?''
লোকটা বলল, "আমি আজহার, তুমার মামা''
অভি বারান্দায় চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল, ''বসেন মামা''
আজহার চেয়ারের বসে তর্জনী মুখের ভেতর দিয়ে মুখের ভেতর জমে থাকা পানের কনা গুলোকে দুই তিনবার নাড়িয়ে অভিকে বলল, ''তা বাবা, তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো।''
অভি বলল, ''জ্বী বলেন''
আজহার বলল, ''তোমার মা আমার অনুকে তোমার জন্য আনতে চাইছিলো, তা নিয়ে তোমার সাথে কথা বলতে আসলাম''
অভি অবাক হয়ে বলল, ''এমন কিছু তো শুনি নি আমি''
আজহার বলল, ''ছোট মানুষ শোন নাই তাতে কি!, তোমার মামী তোমারে যেতে বলছে।''
অভি নিজেকে কন্ট্রোল না করতে পেরে বলল, ''মাথা ঠিক আছে আপনার? আমি আপনাকে চিনি না। এসব আজগুবি কথা ছাড়া কিছু বলার থাকলে বলেন, নয় তো আসতে পারেন।''
আজহার পানির পিক ফেলে চেয়ারে চুন মুছে, মুচকি হাসি দিয়ে প্রস্থান করলো।
অভি হাফ ছেড়ে বাঁচলো। আপাতত বিয়ে করার কোন ইচ্ছে নেই, একাকী জীবন বেশ শান্তি। তবে রান্না একটু ঝামেলা, কিন্তু মর্জিনার মা মাঝে মধ্যে রান্না করে দেয় বিনিময়ে কিছু অর্থ দিলেই হয়ে যায়। অভি বারান্দা হতে রুমে ডুকে দরজার খিল দিয়ে ঘাড় ঘুড়াতেই দেখলো ঝুড়িতে বেশ কয়েক রকমের ফল। কি হচ্ছে এসব! এবার চিন্তিত না হয়ে বসে থাকা যায় না। অভি ঝুড়ি হতে একটা আপেল নিয়ে নাকে নিকট নিলো। বাজে কোন স্মেইল নেই, স্পর্শে মনে হলো আসল ফল। সবই তো ঠিকঠাকই আছে। অভি আপেলে কামড় দিলো, নরমাল আপেল গুলো হতে এটা একটু অন্যরকম স্বাদের।
চোখটা লেগে আসছে প্রায়। অভি ঘুম দিলো। মাগরিবের আজানে অভির ঘুম ভাংলো। শুনা গেলো ইয়াসিন বয়াতি রাত দশটা নাগাদ আসবে। অভি বিছানা হতে ওঠে চোখে পানি দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। বৃষ্টি ভেজা পিচ্ছিল গ্রামের আঁকাবাকা পথ, পথের পাশে ব্যাঙ এর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডাকে মুখর চারদিক। ততোক্ষণে অভি পাঁচগাওয়ে পৌঁছালো।
গানের আসর শুরু হয়ে গিয়েছে। দমকা বাতাস বইছে খুব। দক্ষিণা বাতাসে হারিকেনের আলো মিটিমিটি করে জ্বলছে। একদিকে বাতাস অন্যদিকে বয়াতির স্বরে গান আরো আন্দোলিত হতে শুরু করলো। গান শুনতে শুনতে কখন যে রাত দুইটা বেজে গেলো বুঝতেই পারলো না অভি।
বাড়ি ফিরতে দু'ঘন্টা লাগবে। সামনে একটা ইস্কুল আছে৷ ইস্কুলের বারান্দায় ঘুমানোর অভ্যাস আছে। অভি গায়ের শার্ট খুলে ধুলাবালি পরিষ্কার করে মাথার নিচে হাত দিয়ে শুয়ে পড়লো। ''দূরে শেয়াল ডাকার শব্দ আসছে তাতে কি, শেয়ালের কাজ শেয়াল করছে। আমার কাজ ঘুমানো।''
অভির দু'চোখের পাতা একে অপরকে স্পর্শ করলো। অভি সকালে চোখ খুলে দেখে ইয়াসিন বয়াতি অভির পাশে শুয়ে আছে। অভি বয়াতিকে ডেকে বলল, ''বয়াতি আপনি এখানে?''
বয়াতি ঘুম চোখে বলল, ''হুম, সবই আমার বসতবাড়ি।''
অভি বয়াতিকে কিছু না বলে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলো। মাঠের পর মাঠ পিছু ফেলে অভি ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে খাটে শুয়ে পড়লো।
অভি টেবিলের দিকে চোখ ঘুরাইতেই দেখে খাবারের ডিশ। অভি একটু চিন্তিত হয়ে গেলো। এই খাবারের উৎস কি! কিছুই বুঝে ওঠতে পারছিলো না অভি। রুমে সু-ঘ্রাণ আসছিলো। অভির আচমকা ভয় কাজ করছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। বুকে ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে। অভি দরজা খোলে রুমের বাহিরে বেরিয়ে গেলো।
সিমেন্টের চেয়ারে অভি বসে আছে। রুমে রেখে আসা মোবাইলে কল আসার শব্দ হচ্ছে। অভি ভয়ে ভয়ে পুনরায় রুমে গেলো। ঘ্রাণ আরো প্রকট হচ্ছে। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো কোন কল আসে নি। হঠাৎ আপনাআপনি রুমের দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। অভি ঘাড় ঘুড়িয়ে লেখলো মধ্যবয়সী একটা রূপবতী মেয়ে দাড়িয়ে আছে। অভি আগে এমন সুন্দর মেয়ে দেখে নি।
অভি অবাক হয়ে মেয়েটাকে বলল, ''আপনি কে?''
মেয়েটা অভির চোখের দিকে মুচকি হাসি দিয়ে খানিক তাকিয়ে বলল, ''অনু''
ততোক্ষণে অভির চোখের পলকে মেয়েটা অদৃশ্য হয়ে যায়।

Comments

Popular posts from this blog