চন্দ্র নিশীথ লেখা: নাসিম কবির
চন্দ্র নিশীথ
লেখা: নাসিম কবির
'স্যার ম্যাগপাই হতে চাই।'
ইকবাল সাহেব অবাক হয়ে বলল, 'মাথা ঠিক আছে তোমার?'
ইকবাল সাহেব মুচকি হেসে চশমা খুলে মুছতে মুছতে বলল, 'মৃত্যুর পরে পশু-পাখি হয়ে ফিরে আসা বিশ্বাস করো?'
ইব্রাহিম ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ইকবাল সাহেবের দিকে ঝুকে বসে বলা শুরু করলো, 'জ্বী না স্যার, তবে খুব ইচ্ছে জাগছে মনে। আমি ম্যাগপাই হয়ে ফিরে আসি। এক লাফে এক ডাল থেকে অন্য ডালে বসবো। আমার হালকা ভারে হলদে পাতা গুলো ঘুরেঘুরে নিচে পড়বে।'
ইকবাল সাহেবের মুচকি হাসি খিলখিল করে হাসিতে রুপান্তরিত হলো
ইকবাল সাহেবের বাগান বাড়ি ইব্রাহিম দেখাশোনা করে। ওনার মুখে খোঁচা খোঁচা আধপাকা দাড়ি। চুল গুলো খুব পরিপাটি, সুযোগ পেলেই ফতুয়ার পকেট থেকে চিরুনি বের করে তা দিয়ে চুল ঠিক করতে ব্যস্ত।
তিনি খুব রসিক মানুষ, সেই সুবাদে ইকবাল সাহেবের মনে ইব্রাহিম স্থান করে নিয়েছে। মাঝেমধ্যে ইব্রাহিমের অদ্ভুত অদ্ভুত কান্ড ইকবাল সাহেবকে সহ্য করতে হয় তবুও বিরক্তি আসে না হেসে উড়িয়ে দেয়।
ইব্রাহিম কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে ইকবাল সাহেবকে বলল, 'স্যার কাক হলে কেমন হতো?'
ইকবাল সাহেব কৌতুহল হয়ে জিজ্ঞেস করলো, 'কাক হলে কি করতা?'
'না লাফিয়ে হাঁটার স্টাইলটা আয়ত্ত করতাম, সাথে রহিমা বুয়া থেকে ঠোঁটে পায়ে মেকাপ নিতাম।'
'মহিলা কাক হবার সখ জাগলো কবে থেকে?'
'ইব্রাহিম অট্টহাসি দিয়ে, না না স্যার মহিলা কাক হয়ে ডিম দেবার কোন ইচ্ছে নেই। দেখা যাবে শেষে কোকিলের ডিমও আমার ফোটানো লাগতেছে।'
'তাহলে তো মুশকিল। ছেলে কাক হলে মেকাপ করার কি দরকার?'
'আই উইল বি এ্যা ইউনিক ক্রো, কাকীনিদের রাতের ঘুম হারাম করার চিন্তা আছে।'
ইকবাল সাহেব হেসে বললেন, 'তুমি মোরগ হবার ইচ্ছে পোষন করো। তুমাকে দিয়ে মোরগ পোলাও ভাল জমবে।'
'স্যার মোরগ পোলাও খাবেন?'
ইকবাল সাহেব বলল, 'মন্দ হয় না তাতে। তাহলে নৈশভোজের আয়োজন করো।'
ইব্রাহিম ঘর থেকে বের হবার সময় বিরবির করে বলছে, 'কোন ইব্রাহিম জানি আজ কুরবানী হবে। আহারে মোরগের জীবন।'
ইকবাল সাহেব ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক, নিউরোলজি বিভাগের কনসাল্টেন্ট। উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার সুবাদে দেশ বিদেশ অনেক ঘুরেছেন। ইকবাল সাহেবের আফসোস একটাই জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে বিশ্বটাকে ভাল করে দেখা হলো না। মানুষকে সেবা করা একটা নেশার মতো। এটাতেই নিজের ভাল লাগা খুঁজে নিয়েছিলো। বয়সের ভাড়ে এখন অবসর কিন্তু পেশাগত নেশা ছাড়ানো খুব মুশকিল। বাগান বাড়ির দক্ষিণ পাশে ইকবাল সাহেবের গড়া হসপিটালে দিনের কিছুটা সময় ব্যায় করে।
ইকবাল সাহেব ইব্রাহিম ডাকলো,
'জী স্যার'
'তুমার মনে আছে গোবিন্দপুরের ভূত বাংলোর কথা?'
'জ্বী স্যার মনে আছে, মিজান বাবুর্চির হাস ভূনা আজো মুখে লেগে আছে। সেই কবে গিয়েছিলাম আপনার সাথে। সময় কিভাবে যেন দ্রুত চলে যায়।'
'তাহলে সাথে আজ হাস ভূনার আয়োজন করো।'
'জ্বী স্যার, বাংলোতে ভূত আছে বলে কি বিশ্বাস করেন আপনি?'
'নাহ, তবে ছোটবেলায় আত্নীয়দের অদ্ভুত কিছু এভনরমাল ঘঠনা দেখেছি। এখন মনে হয় ভৌতিক কিছু না।
ইব্রাহিম ভীতিকর অবস্থায় বলল, 'স্যার এই বাগান বাড়িতে ভূত আছে। গভীর রাত হলে পুকুর পাড়ের সিমেন্ট এর চেয়ারে বসে থাকে।'
'তুমি দেখেছ?'
'জ্বী স্যার, সেদিন রাতে জোৎস্না ছিলো'
ইকবাল সাহেব মজার ভঙ্গিতে বলল, 'নিশ্চয়ই কোন মেয়ে বসে ছিলো?'
'জ্বী স্যার, এগিয়ে যেতেই মিলিয়ে গেলো' ইব্রাহিম থেমে বলল, 'দেখেন স্যার আমার শরীরের লোম দাড়িয়ে গেলো'
ইকবাল সাহেব হেসে বলল, 'ইব্রাহিম তুমি পারোও বটে। যাও খাবারের আয়োজন করো। আর শোন একটু তামাক সেজে দাও।'
'জ্বী আচ্ছা স্যার'
ইকবাল সাহেব চিন্তিত হয়ে হুঁকার পাইপ মুখে নিয়ে বুদ্বুদ শব্দে আশেপাশে ধোঁয়ায় সাদাটে হয়ে আসছে। ইকবাল সাহেবের চোখ গেলো বাড়ির দেউড়ির দিকে। সেখানে ম্যাগপাই বসলো ততোক্ষণে হলদেটে সজনে পাতা ঝড়ে পড়লো। হুট করে মাথায় এসে গেলো এটা ইব্রাহিমের মতো কেউ না তো।
দূর থেকে আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে--
''আল্লাহু আকবার-আল্লাহু আকবার
আশহাদু-আল লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ
আশহাদু-আল লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ''
পশ্চিম রক্তিম আকাশ আস্তে আস্তে অন্ধকারে ঘনিয়ে আসলো। রাতে বেশ খাওয়াদাওয়া করলেন ইকবাল সাহেব।
ইকবাল সাহেব মুগ্ধতায় ইব্রাহিমকে বলল, 'তুমি মিজানের শিষ্য নাকি?'
'না স্যার, সুযোগ পেলে হবার চেষ্টা করতাম'
'খুব ভাল রান্না করেছো, মিজান বাবর্চি থেকে কম না'
ইব্রাহিম লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে। রান্নাবান্না, বাজার তিনিই করে। কাজের মহিলা থাকাতেও রান্নার দায়িত্ব ইব্রাহিম ছাড়তে নারাজ। রান্না ভাল বলে ইকবাল সাহেবও কাজের মহিলার উপর রান্নার দায়িত্ব দিতে নারাজ।
'ইব্রাহিম পান আছে?'
'না স্যার, আপনি একটু অপেক্ষা করেন আমি পান নিয়ে আসি'
হুট করে ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলো, ইব্রাহিম হারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে পান আনার জন্য তাড়াহুড়ো করে বাহিরে অন্ধকার মিলিয়ে গেলো। ইলেক্ট্রিসিটিহীন চৈত্র মাসের গরমের তীব্রতায় টিকে থাকা বেশ মুশকিল। ইকবাল সাহেব হারিকেন হাতে নিয়ে পুকুরপাড়ের চেয়ারে বসে আছে। ততোক্ষণে ইব্রাহিমের বলা ভৌতিক মেয়েটার কথা মনে পড়ে গেলো।
ইব্রাহিমের মুখ দেখে ব্যাপারটা সিরিয়াস মনে হলো। তাই ব্যাপারটা মাথা থেকে যাচ্ছে না। ইকবাল সাহেব মনস্থির করলো যতোক্ষণ ভৌতিক মেয়েটা না আসে ততোক্ষণ সিমেন্টের চেয়ার থেকে ওঠবে না। অবশ্যই মেয়েটা নিজের জায়গায় বরাবর বসতে আসবে। এই তো সুযোগ ভূত দেখার।
ইকবাল সাহেব ভাবছে, আচ্ছা ভূত মেয়েটার নাম কি দেয়া যায় চিন্তিত হয়ে বিরবির করে বলল, আজ আকাশে চন্দ্র ওঠেছে, চন্দ্রাবতী দিলে মন্দ হয় না। মেয়েটা কি খোলা চুলে আসবে নাকি মাথায় বিনুনি থাকবে, বিনুনিতে লাল ফিতে হলে বেশ লাগবে। সাথে শাড়ি পড়ে আসলে ছবিতে সুন্দর করে ভূতের চেহারা ফুটানো যাবে।
ইকবাল সাহেব ছবি আঁকাআকিতে বেশ পারদর্শী।
ঐদিকে ইব্রাহিম হাজির, স্যার নেন আপনার পান। রুমে ফিরে যান, জায়গাটা ভাল না।
ইকবাল সাহেব মুখে পান পুরে বলল, 'তা ইব্রাহিম তোমার চন্দ্রাবতী কখন আসবে?'
'স্যার চন্দ্রাবতী কে?'
'ভূত মেয়েটার নাম দিয়েছি চন্দ্রাবতী'
অট্টহাসি দিয়ে ইব্রাহিম বলল, 'স্যার এখানে থাকা উচিৎ হবে না। ভূতেরা নির্জন স্থান খুব পছন্দ করে।'
আকাশে চাঁদের জোৎস্ন্যায় আশেপাশের সবকিছু মৃদু মৃদু দেখা যাচ্ছে। পাশের কলাগাছটার পাশে লতানো বট গাছ। বাতাসে বটপাতার চটচট শব্দ হচ্ছে। কলাপাতা গুলো বাতাসে নুইনুই করছে। ইকবাল সাহেবের ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ইকবাল সাহেব বলল, 'তুমি বরং যাও, আজকের জোৎস্ন্যা রাতটা বেশ সুন্দর।'
ইব্রাহিম ভীত হয়ে বলল, 'জ্বী স্যার।'
ইকবাল সাহেব বসে আছে। চাঁদ ঠিক মাথার উপর, চাঁদ দেখার সুবিধার্থে সিমেন্টের চেয়ারে শুয়ে পড়লেন। মৃদু বাতাসে কখন যে চোখ লেগে গেলো।
হঠাৎ ইকবাল সাহেবের মাথার পাশে এক নারীর কন্ঠ শুনতে পেলো।
'ডাক্তার বাবু, আমার বাপরে বাঁচান' আমার বাপরে বাঁচান।
ইকবাল সাহেব দেখতে পেলো মধ্যবয়সী এক মেয়ে, গায়ে লাল পাড়ের সাদা শাড়ী। জোৎস্ন্যা রাত তবুও সব স্বচ্ছ দেখা যাচ্ছিলো। ইকবাল সাহেব ভীত হয়ে বলল, কোথায় আপনার বাপ?
মেয়েটা বলল, 'চলেন আমার সাথে।'
ইকবাল সাহেব মেয়েটার পিছু নিলো। নাকে আতরের গন্ধ লাগেছে। গন্ধ বেশ প্রকট, খারাপ লাগছে না। মেয়েটার পায়ে ঘুঙুরের শব্দ হচ্ছে। কি অদ্ভুত অসুস্থ বাবার মেয়ের সখ আহ্লাদের শেষ নেই। বাবা অসুস্থ অথচ মেয়ের পায়ে ঘুঙুর। মেয়েটা লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতেছিলো। পা ফেলায় শুকনো পাতার শব্দের সাথে ঘুঙুরের শব্দ মিলেমিশে অদ্ভুত একপ্রকার শব্দ হচ্ছে।
একপর্যায়ে ইকবাল সাহেব হাঁপিয়ে ওঠে বলল, আর কতদূর?
মেয়েটা কোন শব্দ করছে না। ইকবাল সাহেবের চোখ গেলো মেয়েটার পায়ের দিকে। ততোক্ষণে ইকবাল সাহেবের চোখ রীতিমতো কপালে হয়ে ওঠলো, পা উল্টাদিকে ঘুরানো। মনেমনে ভাবলো। আল্লাহর দুনিয়ায় সবই সম্ভব। কতো কিসিমে’র মানুষ যে আছে তার ইয়ত্তা হিসেব নেই। মেয়েটা মনে হয় জন্মপ্রতিবন্ধি তাই হয় তো পা এমন। আহারে, মেয়েটার জন্য খুব মায়া হচ্ছে।
ইকবাল সাহেব আবার বলল, 'এই যে শুনছেন?'
মেয়েটা নিশ্চুপ। ইকবাল সাহেব একটু জোরে পা চালিয়ে মেয়েটার সামনে এসে দাঁড়ালো। তা দেখার জন্য তিনি একদম প্রস্তুত ছিলো না। মেয়েটার মুখ বিভৎস ভাবে পোড়া, এক চোখ অন্ধ, অন্য চোখের পিউপিল সাদা। মেয়েটা অদ্ভুত ভাবে এক হাসি দিলো। তখন খুব পঁচা দুর্গন্ধ আসতেছিলো। ভয়ে ইকবাল সাহেব তাত্ক্ষণিক জ্ঞান হারায়।
ইকবাল সাহেব ঘুম ভেঙে নিজের হসপিটালে বেডে আবিষ্কার করলো। শরীরটা বেশ দূর্বল লাগছে। রাতে কি ঘঠলো জানতে চাওয়ায় হসপিটালের নার্স বলল, 'আপনাকে কোন এক খালের পাড়ে পড়ে থাকতে দেখে দুইদিন আগে গ্রামবাসীরা হসপিটালে ভর্তি করে দেয়।' নার্সের কথা শেষ না হতেই সাদা পাঞ্জাবী পড়া ছিমছাম দেহের এক লোক হাজির। বিনয়ের সাথে বলা শুরু করলো, 'স্যার আপনার শরীরটা এখন কেমন?'
'হ্যাঁ বেশ ভাল, আপনারা বেশ উপকার করলেন।'
'না না স্যার কি যে বলেন, তা আমাদের দায়িত্ব।'
ইকবাল সাহেব নার্সকে বলল, 'আমার খোঁজে কেউ এসেছিলো?'
'না স্যার, আপনি চাইলে বাসায় ফিরতে পারবেন, আমি রিলিজ এর ব্যবস্তা করে দেই।'
ইকবাল সাহেব বলল, 'তাই করেন'
সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত লোকটা গাড়ি ঠিক করে ইকবাল সাহেবকে নিয়ে বাগান বাড়ির দিকে রওনা হলেন। বাগান বাড়ি পৌঁছে যা দেখলো তা আরো রোমাঞ্চকর। বাড়ির ভেতর গাছের পাতা, বারান্দায় সবুজ ঘাস জন্মেছে, ঘরে তালা দেয়া তালায় মরিচাও পড়েছে খানিক। ইকবাল সাহেব নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না, একরাতের ব্যবধানে এতোকিছু কিভাবে সম্ভব।
ইকবাল সাহেব সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত লোকটাকে বলল, 'আজ কয় তারিখ জনাব?'
'স্যার আজ ২০ তারিখ'
'কতো সাল?'
'২০২৪ সাল, স্যার আজ মার্চের ২০ তারিখ'
ইকবাল সাহেবের মাথা ভনভন করছে। কিভাবে এক রাতের ব্যবধানে কি করে দুই বছর কেটে গেলো।
ইকবাল সাহেব দৌড়ে ইব্রাহিমের থাকার ঘরে গিয়ে দেখলো বিছানার এক মৃত পাখির পাখা এবং হাড় ছড়ানো। মনে হচ্ছে কোন কাকের ডেড বডি।
ইকবাল সাহেব থ হয়ে মাটিতে বসে পড়লো।
Comments