একপশলা বর্ষণ লেখা: নাসিম কবির
একপশলা বর্ষণ
লেখা: নাসিম কবির
১.
অনু জানালা খুলে বাহিরে তাকিয়ে আছে। রাত প্রায় তিনটা বাজাতে চলল। আচমকা আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। ''অনু এতো রাতে জানালা দিয়ে কি দেখো?'' অনু ভয়কন্ঠে বলছে, ''গাড়িতে লাশ।''
আমি হাতে টর্চ এবং ছাতা নিয়ে বৃষ্টির মাঝে বের হয়ে গেলাম। গাড়ির কাছে যতোই এগিয়ে যাচ্ছি মনে একটু বেশি খটকা লাগছে। এই নির্জন ছোট রাস্তায় গরুর গাড়ি ছাড়া অন্যকিছু চোখে দেখা যায় না। কিন্তু ভিনটেজ গাড়ি এই রাস্তায় অবার হেডলাইট জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাতে ব্যাপারটা আরো খটকা লাগছে।
গাড়ির দিকে টর্চ ধরলাম ''কেউ আছেন?'' আমার জোরে আওয়াজে ও কোন সাড়া শব্দ আসছে না। গাড়ির কাছে গিয়ে ভেতরে টর্চ দিলাম, মনে হচ্ছে ভেতরে কেউ একজন আছে। বৃষ্টির পানির জন্য গাড়ির ভেতরে আবছা দেখা যাচ্ছে। গাড়ির গ্লাসে টুংটাং শব্দ করেও কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। আমি গাড়ির দরজার হাতলে ধরে টান দিতেই খুলে গেলো।
মধ্য বয়সী এক লোকের বুকে ছুড়ির আঘাতে সাদা শার্ট রক্তে ছুপছুপ হয়ে আছে। আমি তৎক্ষনাৎ ভয় পেয়ে গেলাম। গাড়ির দরজা লাগিয়ে আমার পুরাণ বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। বাহির থেকে অনুকে ডাক দিলাম। অনু বারান্দায় এগিয়ে এসে বলল,
-গাড়িতে লাশ দেখেছেন?
-হ্যাঁ, তুমি কিভাবে জানো গাড়িতে লাশ?
অনু চুপচাপ হয়ে আছে। আমি অনুকে বললাম।
-খবরদার বড়বাবু তদন্ত করতে আসলে তুমি কিছু বলবা না।
রুমে গিয়ে শহরের বড়বাবুকে টেলিফোনে অনেকবার চেষ্টা করে অবশেষে কল ধরলো।
-বড়বাবু আমি কবির
-হ্যাঁ কবির বলো
-আমার বাড়ির সামনে হেডলাইট জ্বালানো একটা গাড়ি দাঁড় করানো। গাড়ির ভেতরে একটা লাশ।
-হোয়াট কবির। অপেক্ষা করো আমি আসতেছি।
-ঠিক আছে
অনুর মুখটা বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে।
-ভয় পাচ্ছো তুমি?
অনু বলল, ''না''
আমি অনুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে,
''শুয়ে পড় অনু, আমার দায়িত্ব ছিলো বড় বাবুকে জানানোর আমি জানিয়ে দিয়েছি। ওনার যা করার করবে।''
অনু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে আছে। অনুর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আমার চোখ লেগে আসছিলো। বাহির থেকে হাক আসছে, ''কবির সাহেব আছেন?''
দরজা খুলে দেখি বড়বাবু দুই দারোগাকে নিয়ে হাজির। বাবা বেঁচে থাকাকালীন বড়বাবুর যাওয়াআসা করতো। ওনাদের বেশ ভাল শখ্যতা ছিলো।
বড় বাবু বলল, ''ছুড়ির আঘাতে মৃত্যু হয়েছে। তুমি কখন দেখেছো?''
-তিনটা নাগাদ, দেখে এসে আপনাকে টেলিফোন করলাম।
-তুমি কি মৃত ব্যাক্তিকে চিনো?
-না, আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না।
-ঠিক আছে কবির। তোমাকে ধন্যবাদ।
আমি বড় বাবুর সাথে এগিয়ে গেলাম গাড়ির দিকে। বাহিরে ঘুরিঘুরি বৃষ্টি পড়ছে। ভোরে আভায় চারদিক আলোকিত হয়ে ওঠলো। আস্তে আস্তে আশেপাশের মানুষ আসতে শুরু করলো। বড়বাবু খুনের কিছু আলামত সংগ্রহ করে দারোগাদের বলল লাশ গাড়িতে তুলতে। দারোগা লাশটা বেতের পাটিতে মুড়িয়ে গরুর গাড়িতে তুলল। গাড়োয়ান হাতের লাঠির আঘাত গরু চলতে লাগলো। লাশের পা দু'টো দুলছে।
মনটা বিষন্ন লাগছে। বাড়িতে ফিরে পুকুর ঘাটে বসে আছি। বৃষ্টির ফোঁটায় অনেকটা ভিজে গিয়েছি। পুকুরে অনেকদিন গোসল করা হয় না। ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও বাড়ি ফিরি। অনু বসে আছে তাকেও বিষন্ন লাগছে।
-কি হয়েছে তোমার?
অনু কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল,
-পুলিশ এসেছে?
-হুম, লাশ নিয়ে গিয়েছে। একটা কথা ছিলো।
-বলো
-তুমি জানো কি করে গাড়িতে লাশ আছে?
-মৃত্যু চিৎকার শুনেছি, তাই মনে হলো কেউ খুন হলো।
এ নিয়ে আমি আর কিছু বললাম না। পুরুষ অপেক্ষা নারীদের বুঝার ক্ষমতা অসীম হয়।
অনু হঠাৎ বলল, ''আমি বাবার বাড়ি যাবো''
-আজ-ই যাবা?
-হ্যাঁ।
-আমি যাবো নাকি গাড়ি ঠিক করে দিবো?
-গাড়ি করে দিলে হবে।
-ঠিক আছে, তাহলে প্রস্তুত হও।
রাতের খুনের ঘঠনায় মনে হচ্ছে অনুর মন খারাপ। কিছুদিন বাবার বাড়ি থেকে আসলে ঠিক হয়ে যাবে। প্রায় অনেক মাস হলো বাবার বাড়ি যায় না। আমার আপিসের কাজের জন্য যাওয়া হচ্ছে না। আমি ততোক্ষণে গাড়ি ঠিক করে আনলাম। অনু রওনা দিয়ে দিলো।
২.
সপ্তাহ খানেক কেটে গেলো অনুকে আনতে হবে। আপিসের কাজের চাপ একটু কমলো। টেলিফোন বাজতেছে এই অসময়ে কে কল দিলো।
-হ্যাঁলো কবির
-ওহ, বড় বাবু কেমন আছেন?
-ভাল আছি, খুনের কেসের একটা সুরাহা করলাম।
-খুবই ভাল খবর। কিভাবে কি হলো?
-ব্যাংক হতে টাকা তুলে ফিরতেছিলো তিনি, ডাকাতের খপ্পরে পড়েছিলো। কারো ফিংগার প্রিন্ট পাওয়া যায় নি। তবে ডাকাতদের ধরার চেষ্টা করা বৃথা। কেস ক্লোসড এর মতোই।
-বর্তমানে ডাকাতের উৎপাত বেড়ে গিয়েছে।
বড়বাবুর সাথে বেশকিছু সময় কথা হলো। তাতে বুকের উপর থেকে একটা পাথর সরলো। বাড়ির আশেপাশে খুন হলে কিছু ঝামেলা পোহাতে হয় কিন্তু তেমন ঝামেলা পোহাতে হয় নি। হাফ ছেড়ে বাঁচা গেলো।
আপিসের গাড়ি নিয়ে বের হলাম শ্বশুর বাড়ির উদ্দেশ্য। আঁকাবাকা রাস্তা ধরে গাড়ি ছুটে চলছে। একটু দূরে দূরে একেকটা বাড়ি তার মাঝে জঙ্গল, লতাপাতায় যেন রাস্তাকে গ্রাস করতে চায়।
চার ঘন্টার যাত্রায় পৌঁছালাম। শ্বশুর মশাই বারান্দায় বসে তামাক সাজতেছে। আমাকে দেখেই ওঠে এগিয়ে এলো,
-কোন কষ্ট হয় নি তো বাবা?
-না না ঠিক আছে।
আমি আকস্মিক আসায় শ্বশুর মশাই খুব ব্যস্ত হয়ে গেলেন। আপ্যায়নের কোন কমতি রাখলেন না।
অনু বাড়ি ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। সপ্তাহ খানেক আমাকে ছাড়া থাকা মনে হচ্ছে তাকে কষ্ট দিচ্ছিলো।
-এতোদিন পর মনে হলো আমার কথা?
-আপিসের কাজে একটু বেশি ব্যস্ত ছিলাম। ভাবলাম আরো কিছু দিন থেকে এসো, আরেকবার কবে আসা হয় তার তো ঠিক নেই।
অনু মুচকি হেসে বলল, ''চা করবো?''
-হুম করো।
অনু চা ভাল তৈরী করে। আমি সুগার কম খাই, এই পর্যন্ত অনুর চায়ে কোন অভিযোগ নেই। অনু চা হাতে এগিয়ে আসছে। অনু আজ গোধূম রংয়ের শাড়ী পড়েছে তাতে বেশ সুন্দর লাগছে।
-অনু কাল সকালে আমরা ফিরবো।
-আর একদিন থেকে গেলে হয় না?
-না, অন্য কোন এক সময়ে দীর্ঘ দিন থাকা যাবে। আপিসের কাজ জমে আছে।
-ঠিক আছে।
আস্তে আস্তে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ততোক্ষণে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে গেলাম। ঘুম আসছে না একদম। এপাশ-ওপাশ করতে করতে রাত প্রায় আড়াইটা বাজাতে চলল। অনু ঘুম চোখে বলল, ''ঘুমাও নি এখনো?''
-ঘুম আসছে না, ওঠে বসো তো।
-কি হয়েছে?
-তোমাকে দেখবো।
-হইছে আহ্লাদ রাখো, ঘুমাও।
এপাশ-ওপাশ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম জানি না। সকালের রোদের ঝলকানিতে ঘুম ভাংলো। অনু কাপড়চোপড় গুছানো নিয়ে ব্যস্ত। প্রাতরাশ সেরে শ্বশুর বাড়ি হতে বিদায় নিয়ে রওনা নিলাম।
সাই-সাই করে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে।
অনু ঝিমাচ্ছে মাঝেমধ্যে চোখ লেগে আসছে মিনিট দুয়েক পরপর চোখ খুলছে।
রাস্তাটা খুব নির্জন। সচরাচর মানুষ দেখা যায় না। আমি গাড়ি থামালাম। অনু চোখ খুলে বলল,
-গাড়ি নষ্ট হলো?
-না, গাড়ী নষ্ট হয় নি।
-তাহলে?
-তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।
অনুর চোখ ঝলমলিয়ে ওঠলো, ''কি সারপ্রাইজ?''
-তাহলে চোখ বন্ধ করো
-ঠিক আছে।
-একটা গিফট বক্স, নিজের হাতে গিফটটা নিবা।
-ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি করো।
আমি গিফট বক্সটা খুলে অনুর দিকে এগিয়ে দিলাম। অনু হাত দিয়ে গিফটে ধরলো। অনু চোখ খুলে চিৎকার দিলো।
কবির তুমি একটা কি করলে?
আমি গিফট বক্সটার মুখ লাগিয়ে দিলাম। আমি অনুর চোখের দিকে তাকিয়ে,
-হ্যাঁ, রাসেলস ভাইপার। সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ। এটা তোমার গিফট ছিলো।
অনু সাপের কামড়ে ছটফট করছে।
-তুমি এটা কেন করলে?
-সেদিন গাড়িতে যে তোমার প্রেমিক ছিলো তাকে আমিই খুন করেছিলাম। সেদিন রাতে ঘুমাই নি আমি, তোমার পিছু নিয়েছিলাম। তোমরা গাড়িতে দু'জন ছিলে। তুমি বৃষ্টিতে ওয়াশরুমে ভেজা কাপড় পরিবর্তনের সময় কালে আমি তাকে খুন করলাম। হাহাহা
অনু আস্তে আস্তে করে মৃত্যুর কোলে ঢ'লে পড়লো। গাড়ির দরজা লাগিয়ে সাপের বক্সটা পাশে থাকা খালে ছুঁড়ে দিয়ে একটা সিগারেট ধরলাম। বুকের ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে আসছে। সিগারেটটা শেষ করে অনুর লাশটা নিয়ে হসপিটালে নিয়ে গেলাম।
ডাক্তার অনুকে মৃত ঘোষণা করলো এবং সাথে একটা সাপে কাটার ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে বিদায় দিয়ে দিলো। তাতে পুলিশ আর হাঙ্গামা করে নি। অনুর মৃত্যুতে বড়বাবু খুবই দুঃখ প্রকাশ করলো।
-ধন্যবাদ
Comments