সাঁঝবেলার রোজনামচা লেখা: নাসিম কবির

 সাঁঝবেলার রোজনামচা

লেখা: নাসিম কবির

মাথার উপর প্রচন্ড জোরে ফ্যান ঘুরছে, সাথে আমার মাথাটাও ঘুরছে। আমার ডাকে মীম ছুটে এলো।
'ফ্যানটা অফ কর'
মীম ফ্যান অফ করতে করতে বলল, এতো গরম, তোমার গরম লাগে না ভাইয়া?
আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে, 'নাহ, একটা কম্বল দিয়ে যা।'
মীম তাড়াহুড়ো করে রুম হতে বেরিয়ে গেলো। মিনিট পাঁচেক পর কাঁধে করে একটা কম্বল নিয়ে হাজির। 'ভাই এই নাও কম্বল'
আমি একনজরে তার দিয়ে তাকিয়ে আছি। বুদ্ধিমতী মেয়ে হলে আমার চোখের ভাষা বুঝে নিতো। তার দিকে তাকিয়ে বললাম, 'আমার গায়ে দিয়ে দে।'
আমার কথা মতো মীম গায়ে কম্বল দিয়ে রুম থেকে চলে গেলো।
কম্বলের গরমে শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে। তা গা থেকে সরিয়ে বসে পড়লাম, মাথা ঘুরানো কমছে না। মাথা ঘুরানো কারন হচ্ছে মা-বাবার পছন্দের পাত্রীর ছবি টেবিলের উপর রেখে গিয়েছে মীম।
বিয়ে করতে চাচ্ছি না, বউ নামে মানুষ গুলো স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। সবসময় দৌড়ের উপর রাখে। বন্ধুদের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আমার বিয়ের সাধ মিটে গিয়েছে।
কিছুদিন বাড়ির বাহিরে থাকা হলে বিয়ের কথা শুনা হতে দূরে থাকার উত্তম পরিকল্পনার অন্যতম হবে। প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। দীর্ঘ কাজের চাপে ভ্রমণ নিজেকে সজিবতায় ফিরিয়ে দিবে। চন্দ্রপুর জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্য গাড়িতে চেপে বসলাম।
পাশের সিটের লোকটা গাড়ির ঝাঁকুনিতে ঘুমের ঢ'লে আমার কাঁধে মাথা রাখছে। লোকটার মুখমন্ডলে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে তাতে আমার শার্ট ভিজে একাকার।
বিরক্তের স্বরে বললাম, "চাচা সোজা হন"
বয়ষ্ক লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হলো চোখের পিউপিল সাদা হয়ে আছে। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে সামনে তাকিয়ে লোকটা বলল,
''ড্রাইভার আমাকে নামিয়ে দাও''
লোকটা গাড়ি থেকে নামতে নামতে আমার দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকিয়ে আছে। একটু অদ্ভুত লাগলো লোকটাকে। কিন্তু কোন স্টপেজ ছাড়া জনশূন্য স্থানে গাড়ি থেকে নামার কারন খুঁজে পেলাম না।
গাড়ি গন্তব্যের শেষ স্টপেজে থামলো। কিন্তু আধঘন্টা দাড়িয়ে থেকে কোন রিকশা দেখছি না। পায়ে হাঁটা ছাড়া কোন উপায় না দেখে পথচলা শুরু করলাম। আকাশে মেঘ জমেছে, ঝড়োবাতাসে গাছের পাতা মাটিতে ঝড়ে পড়ছে। তা খুব সুন্দর দেখায়।
অতি বাতাসে বৃষ্টি হয় না। বৃষ্টির ভয় কেটে গিয়েছে। বৃষ্টি হলে বিপদে পড়তাম।
ততোক্ষণে গন্তব্যস্থলে আসলাম গা ছমছম করার মতো ভয়ংকর সুন্দর বাড়িটি। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়ছে। জমিদার বাড়িটির সামনের ভাঙা মূল ফটক অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে। একতৃতীয়াংশই ভাঙা। বিশাল বড় বাড়ি কিন্তু অযত্নে বিভিন্ন লতাপাতায় জড়িয়ে আছে। পশ্চিম পাশে দ্বিতীয় ফটকের ভেতর বাড়িটি পূর্বপাশে মন্দির দক্ষিণ পাশে কারুকাজ সমৃদ্ধ অতিথিশালাটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
দ্বিতীয় ফটক দিয়ে জমিদার বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলাম। জমিদার বাড়িটির আর্কিটেকচার খুবই মনোমুগ্ধকর এবং নিখুঁত শৈল্পিক কাজ। এখনো যথেষ্ট ভালো অবস্থাতেই আছে বাড়িটি। পা ফেলতেই ঝরাপাতা মর্মর শব্দে নিজেকে অনেকটা বিমোহিত করে তুললো। এই বাড়িকে ঘিরে ইতিহাস ভাল ছিলো না, অত্যাচারী জমিদার ছিলেন।
হঠাৎ চোখ গেলো পূর্বপাশের একটা রুমের দিকে প্রদীপ জ্বলছে, তখন সন্ধা প্রায়। আগ্রহী হয়ে রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রদীপ রাখার একাধিক ছোট ছোট খোপে পঞ্চপ্রদীপ সাজিয়ে আলোকসজ্জায় রুমটা। সিংহ কারুকাজে সজ্জিত খাট, তাতে পরিপাটি বিছানা। আলমিরা, একপায়া টেবিলের উপর প্রমত্ততা রাখা, পাশে লম্বা পাইপের হুক্কা তার পাশে চেয়ার। তার অন্যপাশে গ্রামোফোন।
আমার চক্ষু চড়কগাছ, এটা সত্যি নাকি আমার ভ্রম। মেঝেতে কার্পেটের উপর গোলাপ ফুলের পাপড়ি দেয়া তা রুমের অন্য দরজা দিয়ে অন্যদিকে চলে গিয়েছে। একটু সামনে এগিয়ে গেলাম আমি রীতিমতো অবাক স্নানাগার তাও এতো সাজসজ্জায়।
এই পুরনো বাড়িতে কিভাবে তা সম্ভব, মাথায় আসছে না। রুমে ফিরে হাক দিলাম, ''কেউ আছেন?''
কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
''কেউ আছেন বাড়িতে?''
চারদিক নিশ্চুপ এবং অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছে। জমিদার বাড়িতে রাত্রি যাপন অনেক আগে থেকে সখ ছিলো, আজকে তা বাস্তবে রুপ পেতে যাচ্ছে।
গ্রামোফোনে গান চলছে, হুক্কায় আগুন দিয়ে চেয়ারে হেল দিয়ে তামাক সাজতেছি। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। তবে তাতে মন্দ লাগছে না। হুক্কার ধৌয়া উপরে কুন্ডলী পাকিয়ে ওঠে রুমটা সাদাটে হয়ে গিয়েছে।
বেশ গরম কিন্তু এখন তেমন গরম অনুভূত হচ্ছে না। তাতে স্নান করলে ভাল লাগবে। পানি বেশ ঠান্ডা, এই অনুভূতিটা হয় যখন শীতকালে পানিতে হাত দেই।
অদ্ভুত কিছু হচ্ছে আমার সাথে তা বুঝতে পারছি। তাতে কি মুহুর্ত গুলো তো ভালই কাটছে। গায়ে পানি ঢাললাম ইতোমধ্যে ঠান্ডা পানিতে আমার কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় স্নানাগারের একে একে সব গুলো প্রদীপ নিভে গেলো। বাড়িটা আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠলো।
কারো পায়ের আওয়াজ কানে আসছে। ''কে এখানে?'' দূর হতে হাতে প্রদীপ নিয়ে কেউ এগিয়ে আসছে। আমার গায়ে কাটা দিয়ে ওঠলো। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসা আলোর মানুষটা দৃশ্যমান হতে লাগলো। এলোকেশী মধ্যবয়সী এক মেয়ে। গায়ে লাল পাড়ের সাদা শাড়ী, আলতা হাতে লাল চুড়ি। চোখে কাজল আঁকা, প্রদীপের আলোয় চোখ জ্বলজ্বল করতেছে।
আমার গলা শুকিয়ে আসছে। ভয়ার্ত কন্ঠে বললম, ''কে আপনি?''
মেয়েটা কোন কথা বলছে না, আমার ভয়ার্ত চোখে মেয়েটার দিয়ে তাকিয়ে আছি। আমাকে তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে প্রদীপ রেখে প্রস্হান করলো।
স্নান শেষ করে রুমে এসে দেখি কেউ নেই। প্রদীপ স্বাভাবিক ভাবেই জ্বলছে। দৃষ্টিভ্রম হয়েছিলো মনে হয় কিন্তু এই তোয়ালে আসলো কি করে। প্রকট হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণ আসছে। হাসনাহেনা ফুলের সন্ধানে রুম থেকে বের হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে ছাদের প্রাচীর হতে ঘ্রাণ আসছে।
ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে ছাঁদে এসে আমি মনে হচ্ছে চাঁদ হতে পড়লাম। ঐ মেয়েটা ছাদের রেলিং ধরে দাড়িয়ে আছে।
আমি আস্তে আস্তে করে মেয়েটার কাছে এগিয়ে গেলাম। মেয়েটা ঘাড় ঘুড়িয়ে আমার দিকে ফিরে মুচকি হাসি দিলো। এমন হাসি, এমন মায়াবী চেহারা আমি আগে কখনো দেখি নি।
মেয়েটা বলল, ''রাতটা সুন্দর তাই না?'' আমি বললাম, ''হ্যাঁ, তবে আপনি কে?'' মেয়েটা বলল, ''গান শুনবেন?''
এমন নারী কন্ঠ আমি আগে কখনো শুনেছি বলে মনে হয় না। কন্ঠে কেমন যেন অদ্ভুত মায়া আছে। মেয়েটা গান গাইতে শুরু করলো,
''তব কেন উচ্ছ্বাস এ মহিমায়
আমি কেহ নই, কেহ নই এই ধরায়
এসেছো তুমি কোন মোহ-মায়ায়
তবে আসো বারবার এই রজনীতে''
গানের সুরে আমাকে মাতাল করে দিলো, মুগ্ধতার চোখে মেয়েটার মুখের দিকে আছি। আগে কখনো এমন করে কাউকে দেখি নি। চোখটা নুইনুই করে চোখ লেগে আসছে। মেয়েটা গানটা থামিয়ে বলল, ''চা খাবেন?''
আমি অবাক হয়ে বললাম, ''এই রাতে চা পাবেন কি করে? তার আগে বলেন আপনি কে?''
মেয়েটা হাসি দিয়ে ছাঁদের পশ্চিম পাশে হেঁটে চলে গেলো। আমি থ হয়ে দাড়িয়ে আছি। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে বাতাসে চাঁদের আলো নিভুনিভু করছে। মেয়েটা পেছন হতে বলল, ''আপনার চা।''
আমি বিস্মিত চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছি। কিছু না ভেবেই চায়ে চুমুক দিলাম। চা ভাল হয়েছে খুব। মেয়েটা জানলো কি করে আমি চায়ে চিনি কম খাই! মেয়েটা হঠাৎ বলে ওঠলো, ''আপনার চা কি শেয়ার করা যাবে?'' আমি কথার উত্তর না দিয়ে চায়ের কাপ এগিয়ে দিলাম। মেয়েটা চায়ে চুমুক দিলো। বিয়ে না করার ভূতটা মনে হয় মাথা থেকে নেমে যাচ্ছে। আকাশ হতে ঘুরিঘুরি বৃষ্টি পড়ছে আমি বিদায় না নিয়ে রুমে ফিরলাম। কিন্তু মেয়েটা কে! আশেপাশে ঘরবাড়ি নেই, এতোরাতে মেয়েটা পুরনো বাড়ির ছাদে কি করে। আর এতোই সাজসজ্জা কেন এই রুমে! অথচ কেউ নেই। মাথায় এসব ঘুরপাক খাচ্ছে।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, একটা প্রদীপ ব্যতীত বাকী সবগুলো বাতাসে নিভে গিয়েছে।
চেয়ারে তামাক সাজতে সাজতে জানালা দিয়ে বাহিরের বৃষ্টির তান্ডব দেখছি।
হঠাৎ মেয়েটা রুমে ডুকলো। অর্ধভেজা অবস্থায় খাটের উপর বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু অস্বাভাবিক লাগছে দেখতে। মেয়েটা বলে ওঠলো, ''তামাক সাজা বন্ধ করেন।''
এটা কোন অধিকারে বলল নাকি ধোঁয়ায় সমস্যার জন্য বলল বুঝতেছি না। হুক্কার পাইপ রেখে দিলাম। মেয়েটা এক অট্টহাসি দিয়ো। এমন হাসিতে গা ছমছম করে ওঠলো। প্রদীপের আলোতে দেখতে পাচ্ছি মেয়েটার মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। মেয়েটা জোরে বিকট এক চিৎকার দিলো। ভয়ে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি এবং তাৎক্ষণিক জ্ঞান হারাই।
সকালে নিজেকে আবিষ্কার করলাম জমিদার বাড়ির সেই খাটে শুয়ে আছি। আমার একপাশে মা-বাবা, অন্যপাশে রাতের ঐ মেয়েটা আর মীম বসে আছে। আমার চক্ষু চড়কগাছ। আমি অবাক হয়ে, ''আপনি! রাতে ঐ মেয়েটা আপনি ছিলেন?''
মেয়েটা হেসে বলল, ''হুম আমি ছিলাম''
আমি শুয়ে থাকা অবস্থা হতে বসে গেলাম, ''তাহলে মুখে রক্ত, এই বাড়িতে এতো আয়োজন কিভাবে কি? আর আমি এখানে আসবো জানলেন কি করে?''
মেয়েটা বলল, ''আপনি ডায়েরি লিখেন, মীমের মধ্যমে তা পেয়েছি। বাকী সবকিছু পরিকল্পনা মতো করেছি''
আমি অবাক হয়ে, ''আর মুখে রক্তের ব্যাপারটা?''
মেয়েটা বলল, ''হরর ফেইক ব্লাড পিল ব্যবহার করে।''
আমি ঘাড় ফিরিয়ে মা-বাবা, বোনের মুখের দিকে তাকাতেই মুচকি হেসে রুম হতে বেরিয়ে গেলো।
মা-বাবা প্রস্হান করলে মেয়েটা চেচিয়ে বলে ওঠলো, বিয়ে করবেন না আমায়?
আমি মেয়েটার চোখের দিকে তাকালাম। মেয়েটার চোখ দু'টি ছলছল করছে।
আমি জীবনে কঠিন সিদ্ধান্ত বললে দিলাম, ''হুম করবো এবং এই মুহুর্তে''

Comments

Popular posts from this blog